হরগজা ঝোপ ধরনের গাছ বা গুল্ম। বাংলায় একে হরকুচ, কটকি বা টেংরাকাঁটাও বলা হয়। ইংরেজিতে হরগজাকে Holly Mangrove বা Sea Holly বলা হয়। হরগজার বৈজ্ঞানিক নাম Acanthus ilicifolius। সামান্য লবণাক্ত থেকে তীব্র লবণাক্ততায়ও এ গাছটি জন্মতে ও বেড়ে উঠতে পারে। সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চলের নদী বা খালের পাড়ে এবং ডোবা ও জলাভূমিতে এগাছগুলো জন্মে থাকে। সুন্দরবনের সর্বত্রই গুল্মজাতীয় এ গাছটি দেখা যায়। তাছাড়া খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, পটুয়াখালি, বরগুনা ও ভোলা জেলায় এগাছ পাওয়া যায়।
হরগজা এক থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এদের পাতার রঙ গাঢ় সবুজ এবং পাতা খুব শক্ত। পাতার কিনারা ঢেউ খেলানো। নিজেকে রক্ষা করার জন্য গাছগুলোর পাতার গোড়ায় ও অগ্রভাবে কাঁটা থাকে। এর কাঁটা যথেষ্ট শক্ত। এর শাখা থেকে বেরোনো ছোট্ট শীষের মাথায় ফুল ফোটে। ফুলের রঙ নীল। ফুল ফোটে গ্রীষ্ম এবং বর্ষা দুই ঋতুতেই। হরগজা ফুলে প্রচুর পরিমাণে উত্কৃষ্ট মানের মধু উত্পন্ন হয়। মধুর জন্য বিখ্যাত সুন্দরবনের মৌ-মাছিদের মধু সংগ্রহের অন্যতম উত্স এই হরগজা ফুল। হরগজার ফুল থেকে ক্যাপসুলের মতো ফল হয়। প্রত্যেকটি ফলে চারটি করে বীজ থাকে। ফলের বীজগুলো চ্যাপ্টা ও সাদাটে। ফল পাকার পর শুকিয়ে গেলে শব্দ করে ফেটে যায়। এতে ফলের বীজ ছুটে প্রায় দুই মিটার দূরে গিয়ে পড়ে। এভাবে হরগজা বংশবৃদ্ধির পাশাপাশি বসতির এলাকা বাড়ায়।
হরগজা গাছের বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনের বনজীবীরা হরগজার অল্প বয়স্ক পাতাকে শাক হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া ভারত ও চীনের প্রথাগত চিকিত্সা পদ্ধতিতে হরগজার ব্যবহার রয়েছে। হাঁপানি, প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত ও পঙ্গুত্বের চিকিত্সায় হরগজার মূল ব্যবহূত হয়। হরগজার পাতার রস বাতযন্ত্রনা লাঘব করে। এ গাছের শিকড়, কচি কান্ড ও পাতা সাপের বিষক্রিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। তাছাড়া হরগজার মূলের ক্বাথ গড়গড়া করলে দাঁত ও মুখের ঘায়ের উপকার হয়। পক্ষাঘাতের চিকিত্সায় হরগজার সিদ্ধ মূলের সঙ্গে সরিষার তেল মিশিয়ে সুন্দরবনের আদিবাসীরা ব্যবহার করেন বলে জানা যায়।
এতগুণ থাকা সত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আমাদের দেশে হরগজার সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সুতরাং জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মধু উত্পাদন ও মানুষের রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের লক্ষ্যে উপকারী গুল্ম হরগজা গাছের যত্ন-পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা একান্ত প্রয়োজন।
