কারাগারকে আধুনিক যুগে সংশোধনাগার হিসাবেই অভিহিত করা হয়। এখানে বন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো অবকাশ নাই। বন্দিদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা অবশ্যই নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহাদের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হইল চিকিত্সাসেবা লাভ। কিন্তু বাংলাদেশে বন্দিদের সুচিকিত্সা অপ্রতুল। অনেক সময় চিকিত্সকের অবহেলায় কোনো কোনো বন্দি মৃত্যুবরণ করে থাকে। আমরা প্রায়শ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কারাগার হইতে বন্দিদের নিয়া আসিয়া চিকিত্সা করাইতে দেখি। কারাগার অভ্যন্তরেই ভালো মানের স্বাস্থ্যসেবা থাকিলে তাহাদের এই বিড়ম্বনার শিকার হইতে হইত না। জানামতে, সারাদেশে কারাগার রহিয়াছে ৬৮টি। এই সকল কারাগারে বন্দি রহিয়াছে প্রায় ৯০ হাজার। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হইল, তাহাদের জন্য চিকিত্সক রহিয়াছে মাত্র ৯ জন! এই ৯ জন চিকিত্সক দিয়া এত বন্দির সুচিকিত্সা যে সম্ভব নহে, তাহা সহজেই অনুমেয়।
বাংলাদেশের কারাগারগুলিতে ৪০ হাজার ৬৬৪ জন বন্দি থাকিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে রহিয়াছে ৮৯ হাজার ৯১০ জন। কারাগারগুলিতে ধারণক্ষমতার চাইতেও অধিক বন্দি থাকিবার কারণে যেইখানে চিকিত্সাসুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, সেইখানে বিদ্যমান সুবিধাই নিশ্চিত করা হইতেছে না। যেমন—একটি ২০০ শয্যাবিশিষ্ট কারা হাসপাতালের জন্য ১৪১ জন চিকিত্সকের অনুমোদিত পদ রহিয়াছে। কিন্তু তাহার বিপরীতে কর্মরত রহিয়াছেন আট জন সহকারী সার্জন এবং এক জন কনসালট্যান্টসহ মোট ৯ জন চিকিত্সক। এই চিকিত্সক স্বল্পতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ হইতে ২০ জন চিকিত্সককে কারাগারে ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু ইহার মধ্যে মাত্র চার জন যোগদান করিয়াছেন, বাকিরা এখনো যোগদান করেন নাই। কেন করেন নাই, তাহা আমাদের বুঝিতে অসুবিধা হয় না। যেইখানে প্রধানমন্ত্রী বারংবার বলিবার পরও একশ্রেণির চিকিত্সক উপজেলা পর্যায়ে চাকুরি করিতে চাহেন না, সেইখানে কারাগারে চিকিত্সাসেবা দিতে কেহ কেহ যে অনাগ্রহী হইবেন তাহা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। খবরে প্রকাশ, বাকিদের নিয়োগ নিয়া সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয় তথা স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একধরনের ‘বিবাদ’ রহিয়াছে। এমনকি কারাগারে বদলির পরও সেই সব চিকিত্সক কেন কাজে যোগদান করিতেছেন না, তাহার ব্যাপারে খোদ মহামান্য আদালত রাষ্ট্রের নিকট জানিতে চাহিয়াছেন। গত ২৩ জুন এক আদেশে আদালত সারাদেশের সকল কারাগারের ধারণক্ষমতা, বন্দি ও চিকিত্সকের সংখ্যা এবং চিকিত্সকের শূন্য পদের তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেন। ইহাতেই কারাগারের চিকিত্সা ব্যবস্থার একটি বেহাল চিত্র বাহির হইয়া আসে।
কারাগারের বন্দিদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক যক্ষ্মা, টাইফয়েড, কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত। তাহাদের ধারাবাহিকভাবে চিকিত্সার প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষের ইহা মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিত্সক না থাকায় তাহারা সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতে পারিতেছেন না। খোদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ১০ হাজার বন্দির জন্য চিকিত্সক রহিয়াছেন মাত্র দুই জন। গাজীপুরে অবস্থিত কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ শয্যার হাসপাতালে চিকিত্সক রহিয়াছে মাত্র এক জন। জনবলের এই দৈন্যদশার অবসান ঘটাইয়া দেশের কারাগারগুলিতে শীঘ্রই প্রয়োজন মোতাবেক চিকিত্সকের নূতন নূতন পদ সৃজন ও তাহা পূরণ করিবার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানাই।
