আজকাল পত্রপত্রিকা পড়িতে শুরু করিলে নানা নেতিবাচক খবরে আমরা হতাশ হইয়া পড়ি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গন লইয়াও আমরা আশাবাদী হইতে পারি না; কিন্তু আমরা অনেক সময় যেইভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি, তাহাতে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রের কতটা উপকার করিতে পারি জানি না, তবে অজান্তে আমাদের শরীরের উপর একধরনের চাপ নিশ্চয়ই গ্রহণ করি। দেশে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশানুরূপ নহে। প্রায় প্রতিদিন খুনখারাবির খবর পাওয়া যাইতেছে। গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাও ঘটিতেছে। এমনও খবর প্রকাশিত হইয়াছে যে, একজনকে খুন করিয়া তাহার লাশের টুকরা রাস্তায় ছড়াইয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহার পর শত শত যানবাহনের চাকায় তাহা খণ্ডবিখণ্ড হইয়াছে। এই সমাজে বাবা ছেলেকে আবার ছেলে বাবাকে হত্যা করিতেও পিছপা হইতেছে না। সামাজিক এই অস্থিরতায় এমন সব কর্মকাণ্ড ঘটিতেছে, যাহাতে গা শিহরিত হইয়া উঠিতেছে। মন বিষাদে ভরিয়া যাইতেছে। অন্যদিকে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাহা দেখিতে পাইতেছি তাহাও কম বীভত্স ও হতাশাজনক নহে। একটি দেশের একটি বিশেষ বাহিনীর প্রধানকে ড্রোন বিমান হামলা চালাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। সেই হামলার প্রতিশোধ নিতে পালটা হামলা চালানো হইয়াছে। যাত্রীবাহী বিমান পর্যন্ত ভূপাতিত করিয়া ধ্বংস করা হইয়াছে। বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে এখনও যাহা ঘটিতেছে তাহা কোনো সভ্যতার মধ্যেই পড়ে না।
চারিদিকের এইসব নৃশংস-নিষ্ঠুরতম ঘটনায় একজন বিবেকমান মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারিলে তাহার পাগল হইয়া যাইবার কথা। কেননা, আমরা দেখিতেছি, দেশে-বিদেশে নানা অন্যায়-অবিচারের ঘটনা ঘটিলেও শীঘ্রই তাহা হইতে রক্ষা পাওয়া যাইতেছে না। ইহার শেষ কোথায় তাহা কেহ জানেন না। এমতাবস্থায় হতাশার সাগরে বাঁচিয়া থাকিবার মূল মন্ত্রহইল ধৈর্য ধারণ করা। এই ব্যাপারে ইসলাম ধর্ম বিশেষ গুরুত্বারোপ করিয়াছে। ইসলামের সৌন্দর্যই হইল ধৈর্য ধারণ করা। পবিত্র কুরআনের নব্বই স্থানে সবর বা ধৈর্য ধারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হইয়াছে, যেইখানে নামাজের কথা বলা হইয়াছে ৮২ বার। কেননা, জীবনে অভাব-অনটনে, শত দুঃখকষ্টে এমনকি যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও ধৈর্যের সহিত অটল ও অবিচল থাকা প্রয়োজন। এইজন্য আল্লাহ তায়া’লা বলিয়াছেন, ‘ইন্নাল্লহা মায়া’স সবিরিন’। অর্থাত্ নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সহিত রহিয়াছেন। সুরা বাকারার ১৫৩ নম্বর এই আয়াতাংশের আগে আপদেবিপদে সবর ও সালাত বা নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনার কথা বলা হইয়াছে। এমনকি আল্লাহ আমাদের ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা করিবার কথা বলিয়াছেন (সুরা আলে ইমরান-২০০)। সুরা আসরে অন্যকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ প্রদানকারীর কোনো ক্ষতি না হইবার কথা বলা হইয়াছে। এমনকি ধৈর্য ধারণকে সাহসিকতার কাজ (সুরা শুরা-৪৩) এবং ইহার পরিপূর্ণ প্রতিদানের (সুরা জুমার-১০) কথাও উল্লেখ করা হইয়াছে সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থে।
এই কারণে সরকারি বা বিরোধী দল, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক নেতা, সাধারণ মানুষ—সকলের এখন ধৈর্য ধারণ করা আবশ্যক। সারা বিশ্বে এখন দম বন্ধ হইয়া যাওয়ার উপক্রম হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও আমাদের ধৈর্য ধারণ করিতে হইবে। বিশেষত তৃতীয় বিশ্ব বা উন্নয়নশীল বিশ্বে ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া কোনো উপায় নাই। নিশ্চয়ই ধৈর্য ধারণের প্রতিফল একদিন পাওয়া যাইবে।
