ধর্ষণরোধে মেধাবান্ধব সমাজ প্রয়োজন

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৫৩

 ‘পুরুষ হূদয়হীন, মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হূদয় ঋণ...’ পৃথিবীতে প্রতিটি পদক্ষেপেই নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। নারীরা মা, নারীরা বোন, নারীরা স্ত্রী, নারীরা শিক্ষক, নারীরা চিকিত্সক, নারীরা ব্যবসায়ী, নারীরা মন্ত্রী। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারীরা অধিষ্ঠিত হচ্ছেন স্ব স্ব অবস্থানে। তথাপিও নারীরা নিরাপদ নয়। এই বিষয়টি খুবই দুঃখজনক যে স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও নারীরা ধর্ষিত হয়, সচেতন জনগণ বিচারের দাবি নিয়ে ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে আন্দোলন করে এবং কোনো কোনো ধর্ষককে গ্রেফতার করে বিচারের আওতাধীন করাও হয়।

ধর্ষণ একটি ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি। আজকাল পত্রিকার পাতায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচুর ধর্ষণের সংবাদ প্রায় দেখা যায়। ধর্ষণের বেশির ভাগ ঘটনাই ধামাচাপা দেওয়া হয়। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি ঘটনা মিডিয়াতে এলে আমরা কিছু সময়ের জন্য প্রতিবাদ করি। তারপর যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। আমি মনে করি, ধর্ষণপ্রবণতা বৃদ্ধি হওয়ার মূল কারণগুলো হলো—রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, আইনি ব্যবস্থার জটিলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রচার ও প্রসার, সুস্থ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ না থাকা প্রভৃতি।

সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলে বিবেচনা করতে পারার ক্ষমতা শিক্ষার্থীদের মনে প্রশমিত করতে হবে। ছোটোবেলা থেকেই যদি সাহিত্য ও সংস্কৃত নিয়ে কারো মনে উত্সাহের রেখাপাত করা যায়, তবে অন্যায় থেকে অনেক দূূরে থাকার মনমানসিকতা তৈরি হবে। আইনের গতিশীল, সঠিক ও সুষ্ঠু প্রয়োগ থাকতে হবে। অপরাধী শাস্তি পায় না বলে আরো অপরাধ করার স্পর্ধা ও সুযোগ পেয়ে যায়। তাকে দেখে অন্যরাও অপরাধ করতে উত্সাহিত বোধ করে। আরো মানুষ অপরাধ করে। এইভাবে সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র ও দেশ কলুষিত হচ্ছে।

জেনেভা কনভেনশনে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে অনেকেই ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে জাতিগত দমনের উদ্দেশ্যে এবং সেই ব্যবহার এখনো চলছে। যুদ্ধের ময়দানে ধর্ষণকে অন্যান্য মারণাস্ত্রের মতো একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরোনো। একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে অন্তত দুই লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্রায় ২০ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হন। রুয়ান্ডায় এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ, কঙ্গোতে সাড়ে চার লাখ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলাকালে এই পরিসংখ্যান প্রায় একই রকম। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকান কিছু অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা চলমান থাকলেও আমাদের উপমহাদেশে শান্ত পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে। স্বাধীনতার সুবাদে আমাদের দেশে যুদ্ধভিত্তিক ধর্ষণ থামলেও আমাদের জাতীয় জীবনে ধর্ষণ থামেনি। মানবাধিকারবিষয়ক একটি সংস্থার দেওয়া তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩ হাজার ৬৩৮টি, যার ভেতরে গণধর্ষণ ছিল ২ হাজার ৫২৯টি। ধর্ষকদের বিষাক্ত দৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শিশু, প্রতিবন্ধী থেকে ষাটোর্ধ্ব মহিলা কেউই। এই সময়ের ভেতর ৬ হাজার ৯২৭ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ১ হাজার ৪৬৭ জনকে। ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ১৫৪ জন। পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই অনেক ভয়াবহ।

ধর্ষণের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি চিত্র, সেটি হচ্ছে পরিসংখ্যানে ধর্ষণের যে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়, সেটি কেবল পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ অথবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই সংখ্যার বাইরেও আছে বিশাল আরেকটি সংখ্যা, যেখানে নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে না। বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশগুলোতে এই প্রেক্ষাপট কতখানি ভয়াবহ হতে পারে, সেটি সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশ হোক একটা মেধাবান্ধব সমাজ। মেধাবান্ধব সমাজে যে গবেষণাটার প্রয়োজন সেটা এখানে করা হয় না। এখানে চলে বিভিন্ন ধরনের রাজনীতি, ইনক্লুডিং জেন্ডার রাজনীতি যেটা আজকাল শুরু হয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও ইয়াসমিন, বুশরা, শম্পা, তন্নী, মিতু, খাদিজা, নুসরাতসহ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়ে হাহাকার করতে শুনেছি। যাদের বেদনায় কলঙ্কিত বাংলাদেশের সার্বভৌম মানচিত্র। আমি মনে করি, আমরা ৩০ লাখ শহিদের ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত সন্তান। আর তাই, একদিন উচ্চ কণ্ঠে অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে আসবই মশাল হাতে মিছিল নিয়ে!

বিদ্রোহী কবির কণ্ঠে তাল মিলিয়ে বলব—‘বিশ্বে যা কিছু এলো পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,

অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’

n লেখক :প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, সাউন্ডবাংলা স্কুল এবং নির্বাহী পরিচালক, সিডব্লিউএফ