অণুগল্প

পুত্র আমার, স্বাধীনতা তোমার জন্য

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৩৮

আতা সরকার

 

গোঙানির শব্দ। কাছেধারে কোথাও থেকে ভেসে আসছে। চারপাশে গোলাগুলির প্রচণ্ড আওয়াজ। তার মাঝেও স্পষ্ট শোনা গেল গোঙানি।

থেমে গেল ক্রলিং করা দলটি। মুক্তিযোদ্ধাদের ছোটো দল। উপুড় হয়ে কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে তারা ক্রলিং করে করে এগুচ্ছে। তাদের পিঠে শহিদ মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ। রণক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে মুক্ত এলাকার সন্ধানে। সেখানে তাঁকে দাফন করা হবে।

বাতাসে বারুদের গন্ধ। চারদিক থেকেই ছুটে আসছে গুলি বোমা শেল। বিস্ফোরণের প্রবল আওয়াজ। এদিকে রাতে বৃষ্টি হয়েছে। চলার পথ কাদায় পানিতে মাখামাখি। তার মাঝেই সহযোদ্ধা শহিদ এয়ার আহমদের লাশ বহন করে ক্রলিং করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছেন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধারা—মোস্তফা, শহীদ, মোশাররফ, সফিক ও মানু। তিনজন পাশাপাশি উপুড় হয়ে স্ট্রেচার হয়েছেন। তাঁদের পিঠ ও কোমরের মাঝখানে শোয়ানো এয়ার আহমদ। তাঁদের পাশে মোস্তফা ও মানু। মোস্তফা কমান্ড করছেন লেফট রাইট বলে। লাশ নড়ে সরে গেলে তা ঠিক করে দিচ্ছেন মানু। ক্রলিং করে চলছেন তাঁরা। মোস্তফা হল্ট বললেন। গোঙানির আওয়াজ শুনে। শব্দটা ভেসে আসছে পাশের অশত্থগাছের নিচ থেকে। মোস্তফা সবাইকে নির্দেশ দিলেন, খুতনি কাদামাটিতে রেখে বিশ্রাম নিতে। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলেন অশত্থগাছের দিকে। গোঙানির উত্স পেয়ে গেলেন মোস্তফা। এক যোদ্ধা বসে রয়েছেন অশত্থগাছে হেলান দিয়ে। হাবিলদার বায়েজিদ। সারা শরীর রক্তময়। ডান পা-টা নেই। কোমর থেকে আলাদা হয়ে খানিক দূরেই পড়ে আছে। মর্টারের গোলার আঘাতে।

মোস্তফাকে দেখে বায়েজিদের ঠোঁটে হাসি ফুটল। কষ্টের মধ্যেও স্বজনের সান্নিধ্য পাওয়ার হাসি। বিষাদ মাখা। অবসন্ন কণ্ঠে বললেন: পানি।

কোথায় পানি? চারপাশ তাকালেন মোস্তফা। কোনো পুকুর নেই। টিউবওয়েল নেই। গ্রাম নেই। জলাশয় নেই। কোথাও কোনো পানির অস্তিত্ব নেই।

হঠাত্ মোস্তফার দৃষ্টি গেল একটা ছোটো গর্তের দিকে। কাল রাতের বৃষ্টি সেখানে কয়েক আঁজলা পানি জমিয়ে রেখেছে। তিনি দুহাতের আঁজলা ভরে সেই খোলা পানিই এনে ধরলেন বায়েজিদের মুখের সামনে। তাই পান করলেন তিনি। আগ্রহ ভরে। মুখে তৃপ্তির ছাপ। নিজের বর্তমান অবস্থার কথা ভুলে গিয়ে উঠতে ধরলেন। পড়ে গেলেন ডান কাতে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন।

মোস্তফা দ্রুত তাঁর পাশে গিয়ে বসে মাথাটা টেনে নিলেন কোলে।

বায়েজিদ মোস্তফার মুখের দিকে তাকালেন। বললেন: ভাই, আমি আর বাঁচব না। মরে যাচ্ছি। স্বাধীন বাংলা দেখে যাওয়া আমার আর হলো না।

এইটুকু বলতে গিয়েই হাঁফিয়ে উঠলেন তিনি। চোখ বন্ধ করে রইলেন। খানিক পরেই তাকিয়ে বললেন: শীপু। আমার ছেলে। তাকে দেখবেন। স্বাধীন দেশ সে দেখবে।

চোখ বুজলেন। মোস্তফা তাঁর কপালে মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

আবার চোখ মেললেন বায়েজিদ। বড়ো বড়ো চোখ। জোরে জোরে কালেমা শাহাদাত উচ্চারণ  করলেন।

কাছে কোথাও বোমা ফাটল। আর শব্দে ঝাঁকি দিয়ে উঠল বায়েজিদের শরীর। তারপর নিথর।