কালাবদর নদীর ‘ব্যাবাইজ্জা’
শাহীন হাফিজ, বরিশাল অফিস
নৌকায় জন্মের পর সেই শিশুকাল থেকে মাছ ধরা। নৌকাতেই মৃত্যু। আর মৃত্যুর পর ভাসমান জেলেদের ভাগ্যে জোটে মানুষের দান করা কবর। ভিটেমাটিহীন এ জেলেদের নদীতেই জীবনের সবটুকু শেষ হলেও ভাগ্যের উন্নয়ন হয় না কখনোই। নদীতেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও তীব্র শীত মোকাবিলা করে জীবন কাটাতে হয়। জেলে পরিবারের প্রবীণরা জানান, ভিটেমাটিহীন যাযাবর জীবন তাদের। তাই নদীর ওপরের মানুষ তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ‘ব্যাবাইজ্জা’ নামে ডাকে।
লাহারহাট বহরের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি শামছু ঘরামি (৮০) জানান, নৌকাতে জন্মানোর পর তাদের পরিচয় হয় ‘ব্যাবাইজ্জা’ নামে। এ নামটি যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা চিকিত্সা, শিক্ষাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। সন্তানদের পড়াশোনার জন্য স্কুলে ভর্তি করা হলে নদী থেকে তীরে উঠলেই ‘ব্যাবাইজ্জা’ বলে নানান ভাবে উপহাস করা হয়। এতে করে সন্তানদের সঙ্গে বিবাদের সৃষ্টি হয়। সামান্য বিবাদে ডাঙায় থাকা লোকজন হামলা চালালে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয় তাদের।
তিনি বলেন, শিশু থেকে কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সকলেরই একটাই কাজ মাছ ধরে বিক্রি করে পেট চালানো। কিন্তু শুকনো মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় ধার-দেনা ও চড়া সুদে টাকা এনে চলতে হচ্ছে। তাদের কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণও দেয় না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গীবাড়িয়া ইউনিয়নের অধীন কালাবদর নদীর লাহারহাট মোহনায় প্রায় অর্ধশত জেলে পরিবার বেঁচে আছে জীবনের সঙ্গে লড়াই করে। বহরের একেকটি নৌকায় একেকটি পরিবারের বসবাস। নৌকায় জন্ম, নৌকায় বড়ো হওয়া, বিয়ে, সন্তান জন্মদান ও মৃত্যু এই নৌকার ভিতরেই সীমাবদ্ধ।
জেলে পরিবারের একটি নৌকার বাসিন্দা পাঁচ সন্তানের পিতা আ. কাদের সরদার (৬২)। তীব্র শীত উপেক্ষা করে স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর থেকে মেঘনা-তেতুলিয়া ঘুরে বেড়ান। তাদের মতোই এ স্থানের পার্শ্ববর্তী শতাধিক জেলে পরিবার রয়েছে। শুকনো মৌসুম শুরুর পর থেকেই প্রায় দুই মাস নদীতে মাছ না পাওয়ায় এক প্রকার অনাহার চলছে এ ভাসমান জেলে বহরে।
জেলে হাকিম আলী (২৮) বলেন, স্ত্রী ও শিশু সন্তান নিয়ে গত কয়েকদিন তীব্র শীতে নদীতে নামলেও মাছ মিলছে না। নদীর পারে মহাজনদের কাছ থেকে চড়াসুদে টাকা এনে দিন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। আলেয়া বেগম জানান, তার স্বামী বৃদ্ধ শামছু ঘরামি প্রতিদিন বিভিন্ন নদী চষে বেড়ালেও মাছ না পাওয়ায় দিন কাটছে অনাহারে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বরিশাল জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, ভাসমান জেলে পরিবারের সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের সকল পর্যায় থেকে এগিয়ে আসা উচিত। কেননা নৌকাতে থাকা এসব জেলেই প্রকৃত জেলে। এরা এ পেশায় টিকতে না পারলে পরবর্তীতে জেলেদের সংকট দেখা দিবে।
বাসদের জেলা সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী জানান, প্রকৃত ভূমিহীনরাই খাস জমি থেকে বঞ্চিত হয়। তিনি জেলেদের মধ্যে খাস জমি বন্দোবস্তের দাবি জানিয়ে বলেন, তারা রাষ্ট্রের নাগরিক, তাই তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সদর উপজেলার টুঙ্গীবাড়িয়া ইউপির চেয়ারম্যান বাহাউদ্দিন জানান, জেলেদের অধিকাংশই তার ইউনিয়নের বাইরের ভোটার। তারপরও কেউ যদি সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আসে তাকে সহযোগিতা করা হয়। সদর উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা সঞ্জিব সন্যামত জানান, উপজেলার ভাসমান জেলেদের কোনো পৃথক তালিকা নেই। জেলেদের যে সহায়তা দেওয়া হয় তা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দেওয়া হয়। ভাসমান জেলেরা যে এলাকার ভোটার ঐ এলাকার জেলেদের তালিকায় নাম থাকলে সহায়তা পাবে।
বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান জানান, ভাসমান জেলেদের যাচাই-বাছাই চলছে। তাদেরকে পুনর্বাসনের আওতায় এনে স্থায়ী সমাধানের জন্য কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
