পাহাড়ে সংঘাতে এক বছরেই শতাধিক মৃত্যু

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ২২:৩১

চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেই চলেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। গত বছরে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর হামলা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ। নিহতদের অধিকাংশই ছিল এলাকার কুখ্যাত চাঁদাবাজ ও অস্ত্র ব্যবসায়ী। তবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের হামলায় সরকারি কর্মকর্তা, সেনাসদস্য, আওয়ামী লীগ নেতাসহ নিরীহ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। তবে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে পরবর্তী ছয় মাসে সন্ত্রাসী তত্পরতা অনেকটাই কমে আসে। বছরের শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের শুনানিকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। 

জানা গেছে, ২০১৯ সালে শুধু রাঙ্গামাটিতেই আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৪২ জন। গহীন অরণ্যে ঘাপটি মেরে থাকা বেপরোয়া সন্ত্রাসীদের হাতে সেনাবাহিনীর সদস্যকেও প্রাণ দিতে হয়েছে। এছাড়া নিহত অপর ব্যক্তিরা প্রায় সকলেই স্থানীয় উপজাতীয় সম্প্রদায়ের সদস্য এবং         আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় সমর্থক। মূলত ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ জন নিহত হয়েছে মার্চে। ১৮ মার্চ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন শেষে উপজেলা সদরে ফেরার সময় সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে সরকারি কর্মকর্তাসহ আট জন নিহত হন। আহত হন ১৭ জন। প্রতিনিয়ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে। একের পর এক গুম, খুন, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেই চলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের কারণ যতটা না আদর্শিক তার চেয়েও বেশি এলাকার দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, বিশাল সশস্ত্র গ্রুপের কর্মীদের বেতন ভাতা প্রদান।  

বছরের শুরুতেই ১৪ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে মোহন কুমার ত্রিপুরা নামে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-এমনএন লারমা) এক নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ২০১৯ সাল। এছাড়া মানিকছড়িতে ৩৮০ রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধারের ঘটনার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়িতে। ২৬ আগস্ট খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর টহলে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীদের হামলা, পালটা গুলিতে তিন সন্ত্রাসী নিহত হয়। এসময় বেশ কিছু ভারী আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়। একই দিন সকালে দীঘিনালার বড়াদমে সেনাবাহিনীর টহলে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে এ ঘটনা ঘটে। আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনী পালটা গুলি চালালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ)  প্রসীত গ্রুপের তিন সন্ত্রাসী বুজেন্দ্র চাকমা, জ্যোতি চাকমা ও রশিল চাকমা নিহত হয়। খাগড়াছড়িতে প্রতিপক্ষের গুলিতে মোহন কুমার ত্রিপুরা (জেএসএস-এমনএন লারমা) নামে এক নেতা নিহত হয় ১৪ জানুয়ারি। এ হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহ না পেরোতেই পিপলু বৈষ্ণব ত্রিপুরা নামে এক ইউপিডিএফ কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। ৭ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির পানছড়িতে রনি ত্রিপুরা (জেএসএস-এমএন লারমা) নামে এক কর্মীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১৯ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীছড়িতে প্রতিপক্ষের গুলিতে তুষার চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সমর্থক খুন হন।

বান্দরবান গত মে মাসে হঠাত্ অশান্ত হয়ে উঠে। গত ছয় মাসে এই জেলায় অপহরণ ও খুন হয়েছে অন্তত সাত আওয়ামী লীগ ও জেএসএস নেতাকর্মী। ৭ মে সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের দুর্গম তাইংখালী এলাকায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বিনয় তঞ্চঙ্গ্যা নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে সইনক্ষ্যং পাড়ায় গিয়ে পুরাধন তঞ্চঙ্গ্যা নামে একজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তার খোঁজ এখনো মেলেনি। ১৯ মে বান্দরবান-রাঙামাটি সীমান্তের বাঙ্গালহালিয়া এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা ক্যহ্লাচিং মার্মাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ২০ মে রাজবিলায় আওয়ামী লীগ নেতা ক্যচিং থোয়াই মারমা, ২৩ মে পৌর আওয়ামী লীগ নেতা চথোয়াই মং মারমা, ২৫ জুন রোয়াংছড়ি উপজেলার থোয়াইংগ্য পাড়ায় অং সিংচিং মার্মা, ২২ জুলাই রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মংমং থোয়াই মার্মাকে শামুকঝিরি এলাকায় ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। ২৪ জুলাই লামায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক আলমগীর সিকদারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বান্দরবানে একের পর এক আওয়ামী লীগ নেতা হত্যা ও অপহরণের প্রতিবাদে ২৬ মে অর্ধদিবস হরতাল পালন করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। জেএসএস নেতা কর্মীদের হত্যার ঘটনায় বছর জুড়ে আলোচনায় ছিল মগ লিবারেশন পার্টি নামে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর। তবে স্থানীয় সূত্রমতে, হত্যাকাণ্ডগুলো জেএসএসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ঘটতে পারে। অন্যদিকে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের হত্যার জন্য জেএসএসকে দায়ী করেছে তারা।