সৌদি আরব হইতে হাজার হাজার প্রবাসী দেশে ফিরিয়া আসিতেছেন। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। যাহারা জমিজমা বিক্রয় করিয়া কোনোমতে উন্নত ভবিষ্যত্ ও কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে গিয়াছেন, তাহাদের অনেকেই আজ সর্বস্বান্ত হইতেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি বিমানযোগে দেশে ফিরিয়াছেন ১০৯ জন শ্রমিক। এই নিয়া নূতন বত্সরের ১৬ দিনে সৌদি আরব হইতে দেশে ফেরত পাঠানো হইয়াছে ১ হাজার ৬১০ জন বাংলাদেশীকে। তাহাদের অধিকাংশই ফিরিয়াছেন শূন্য হাতে। এমনকি কর্মস্থলের পোশাক পরা অবস্থায়ও অনেককে বিমানে উঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মোট ৬৪ হাজার ৬৩৮ জন কর্মী সৌদি আরব হইতে ফিরিয়াছেন। ইহার মধ্যে ২৫ হাজার ৭৮৯ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হইয়াছে। এই যে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী সৌদি আরব হইতে দেশে ফিরিয়া আসিতেছেন, তাহার পিছনের কারণ কী? আসলে ইহার পিছনে আছে তথাকথিত সৌদি ‘ফ্রি ভিসা’। আছে সৌদি আরবের নূতন শ্রমনীতি ও অর্থনীতির নূতন বাস্তবতা।
সৌদি আরব বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার। কিন্তু ফ্রি প্রকৃতপক্ষে সৌদি আরবের তেলকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে মন্দাভাব বিরাজ করিতেছে। আগামী ১০-২০ বত্সরের মাথায় এই তেল হইতে দেশটির আয় ক্রমশ কমিয়া আসিবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমিয়া আসিবে। এই জন্য সৌদি আরব তাহাদের অর্থনীতিকে নূতন করিয়া ঢালিয়া সাজাইতেছে। ইহার অংশ হিসাবে শ্রমনীতির পরিবর্তন হইয়াছে। কর্মক্ষেত্রে নিজেদের নাগরিকদের অগ্রাধিকার দিতেছে। নয়ানীতি অনুযায়ী ফ্রি ভিসায় যাওয়া শ্রমিকেরা নির্ধারিত সেক্টরের বাহিরে যাইতে পারিবেন না। ২০১৭ সালে সৌদি নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করিতে ১২টি খাতে সৌদি নাগরিকদের নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। ওয়ার্ক পারমিটে যে পেশার নাম উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহার বাহিরে গেলেই বিপদ। এদিকে ৪-৫ লক্ষ টাকা খরচ করিয়া যাহারা সৌদি আরবে যাইতেছেন, তাহাদের ৬০০-৮০০ রিয়ালের বেতনে পোষায় না। তাহাদের ডিউটির পর অতিরিক্ত অর্থোপার্জনের জন্য বিভিন্ন জায়গায় কাজ করিতে হয়। ইহাই তাহাদের জন্য একসময় কাল হইয়া দাঁড়ায়। তাহা ছাড়া আকামা রিনিউ করিতে লেবার অফিসের ফি প্রতি মাসে ৬০০ রিয়ালের বদলে ২০২০ সাল হইতে তাহা ৮০০ রিয়াল করা হইয়াছে। অনেকে রিনিউ না করায় সমস্যায় পড়িয়াছেন।
মোদ্দাকথা, কোনো কর্মী অর্থের বিনিময়ে তাহার স্পনসরের সহিত মৌখিক সমঝোতার ভিত্তিতে স্পনসরের বাহিরে অন্যত্র স্বাধীনভাবে কাজ করাকে তথাকথিত ফ্রি ভিসা বলা হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, দুবাই, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে ফ্যামেলি ভিসা, ভিজিট ভিসা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং ভিসা, খাদেম (বাসা) ভিসা, কোম্পানির ভিসাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসা দেওয়া হয়। তবে ফ্রি ভিসা বলিয়া কিছু না থাকিলেও একশ্রেণির অসাধু বাংলাদেশি স্থানীয়দের যোগসাজশে ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা পদ্ধতি চালু করিয়াছে। অতএব, এই ভিসায় কোনো অবস্থাতেই এখন আর সৌদি আরবে যাওয়া সমীচীন নহে। এই ব্যাপারে সচেতনতা দরকার। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ফ্রি ভিসায় লোক পাঠানো পুরাপুরি বন্ধ করিয়া দেওয়া। ফ্রি ভিসায় সব সেক্টরে কাজ করা যাইবে এমন প্রতারণামূলক প্রচারণাও বন্ধ করিয়া দেওয়া উচিত।
