বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করিতে গেলে অনিবার্যভাবে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করিতে হইবে। ইহার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনৈতিক তত্পরতা। বর্তমানে বৈশ্বিক কূটনীতির একটি প্রধান ধারা হইল, অর্থনৈতিক কূটনীতি। এই দিক দিয়া আমাদের পিছাইয়া থাকার কোনো সুযোগ নাই। সম্প্রতি এমনি এক কূটনৈতিক তত্পরতার খবর আমাদের দৃষ্টিতে আসিয়াছে। খবরটি হইল বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড উপকূলীয় চুক্তি। ইহার মাধ্যমে প্রাচীন একটি নৌপথ পুনরায় চালু করা হইবে। ফলে সমুদ্রপথে দুই দেশের দূরত্ব কমিবে। থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। ১৯৭২ সালের ৫ অক্টোবর হইতে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। বর্তমানে ৩২টি থাই কোম্পানি বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ করিয়াছে। ইহা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে তাহাদের কয়েকটি প্রকল্প চলমান রহিয়াছে। বিমসটেকের (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশের সংগঠন বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) আওতায় থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির অপার সম্ভাবনা রহিয়াছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হইয়াছে, গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবত্সরে বাংলাদেশ থাইল্যান্ডে ৪৪ দশমিক ০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করিয়াছে; একই সময়ে আমদানি করিয়াছে ৯৫২ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক বা লাম চাবাং বন্দরে পণ্য পরিবহন করিতে হইলে বর্তমানে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর হইয়া যাইতে হয়। ইহাতে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সময় লাগিয়া যায় ৭ থেকে ১২ দিন। চুক্তির ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উপকূলীয় নৌযান চলাচল চালু করা গেলে এই সময় নামিয়া আসিবে অর্ধেকেরও নিচে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর এড়াইয়া যাইতে হইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সহিত থাইল্যান্ডের র্যানং বন্দরের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রযোগাযোগ স্থাপন করিতে হইবে। বিষয়টি দুই দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিবে। পণ্য পরিবহনের সময় এবং ব্যয়ও বহুলাংশে কমিয়া আসিবে। ইহাতে উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের উত্সাহ বাড়িবে। পাশাপাশি মিয়ানমার ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের সহিতও যোগাযোগ সম্পর্ক গড়িয়া তুলিতে ইহা সহায়ক ভূমিকা পালন করিবে। আশার কথা হইল, ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে পঞ্চম যৌথ বাণিজ্য কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হইয়াছে। বৈঠকে দুই দেশ নীতিগতভাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে (এফটিএ) সম্মত হইয়াছে।
প্রাচীন এই নৌপথ চালু করিতে কিছু বাধাও রহিয়াছে। যেহেতু বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী দেশ নহে, তাই মধ্যবর্তী দেশ মিয়ানমারের উপকূলীয় জলসীমা ব্যবহার করিতে হইবে। সেই ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে। কূটনৈতিক তত্পরতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড মিলিয়া মিয়ানমারকে চুক্তিতে সম্মত করিতে হইবে। তাহা হইলেই প্রাচীন এই নৌপথ পুনরায় চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্য সম্ভাবনার নূতন দুয়ার উন্মোচিত হইবে।
