ইরান-মার্কিন দ্বন্দ্বে কতটা সংকটে দক্ষিণ এশিয়া!

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১৫

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

বছরের শুরু থেকে চলমান ইরান-মার্কিন যুদ্ধাবস্থায়- আতঙ্কিত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের শান্তিকামী জনগণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু ইরান মার্কিন যদি দীর্ঘমেয়াদি একটা যুদ্ধ বা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তার প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিকে বড়ো ধরনের ধাক্কা সামাল দিতে হবে।

আফগান সরকার, তালেবান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই দশকের যুদ্ধ আর টেনে নিতে পারছে না। ফলে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শান্তি প্রক্রিয়ায় একমত হয়েছে সব পক্ষই। পশ্চিম এশিয়ার দেশ ইরানে কোনো যুদ্ধ শুরু হলে আফগানিস্তানের সে শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবে। এছাড়া আফগানিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গোষ্ঠী ফাতেমিয়ুন প্রতিক্রিয়া দেখাবে নিশ্চিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বর্তমান আফগান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সৌদি, আরব আমিরাত ও মিশর ঘেঁষা। ল্যান্ডলকড আফগানিস্তানের ৪০% বাণিজ্য হয়ে থাকে পাকিস্তানের সড়ক পথ ও বন্দর ব্যবহার করে। ফলে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে ইরানে কোনো হামলা হলে পাকিস্তানের শিয়াগোষ্ঠী আফগান বাণিজ্য বন্ধ করে দিতে পারে।

ভারতের অর্থনীতি অনেকাংশে তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় সৌদি আর মার্কিন মুলুক থেকে তেল কিনতে হচ্ছে ভারতের। এছাড়া ট্রাম্পকে খুশি করতে ইরানের চাবাহার বন্দরে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত সরে এসেছে ভারত। ফলে এই যুদ্ধে একটি স্পষ্ট অবস্থান নিতে হলে ইরানের বিরুদ্ধে নিতে হবে আমেরিকার। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে কোনো ধরনের বাক্য ব্যয় না করা ও ইরানের বিরুদ্ধে যাওয়া ভারতের জন্য কঠিন হবে। এছাড়া ভারতের মোট চা রপ্তানির ১০% বাজার ইরানের। এবছরই ভারত-ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। মার্কিন-সৌদি রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে ভারত ৭০ বছর পূর্তিতে উত্সবের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দেশের ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অভ এগ্রিমেন্ট’ নামে একটি যুক্তি রয়েছে। যার ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ভারতীয় বিমান ও নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। ফলে যুদ্ধ শুরু হলে এই ভারসাম্য কূটনীতি রক্ষা করা মোদির জন্য কঠিন হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত দাঁড়িয়ে আছে গার্মেন্টস শিল্প ও বিদেশি রেমিট্যান্সের ওপর। বাংলাদেশের প্রতি বছর আয়কৃত ১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয়ের ৬০% আসে মধ্যপ্রাচ্যের দশটি দেশ থেকে। এছাড়া বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ। ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্রমেই গুরুত্ব বাড়ছে তেলের। প্রতি বছর ৬৫ বিলিয়ন ডলারের তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরনের যুদ্ধের কারণে তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিও বড়ো ধরনের ধাক্কা খাবে। ধস নামতে পারে প্রবাসী আয়ে, অর্ডার কমে যাবে গার্মেন্টস সেক্টরে। চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে হতে পারে লাখ লাখ প্রবাসী শ্রমিককে। এছাড়া তেলের মূল্য বৃদ্ধি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য হু হু করে বৃদ্ধি পাবে। 

শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ইরানের কৌশলগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। শ্রীলঙ্কার প্রধান চা রপ্তানিকারক ইরান। অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে বেশি দামে অ- ইরানি তেল কিনতে হচ্ছে শ্রীলঙ্কাকেও।

এছাড়া অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন প্রতিদিন ১ লাখ বেরেল তেল আমদানি করে। যার সিংহভাগ আসে সৌদি আরব ও ইরাক থেকে। এই তেলের জাহাজ আসে বহুল আলোচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে।

ফলে ইরান-মার্কিন সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলবে। আর এই যুদ্ধ কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুদ্ধের ভয়াবহতা আরব সাগর হয়ে ঢুকে পড়বে ভারত মহাসাগর আর বঙ্গোপসাগরে। অন্যদিকে এই যুদ্ধে অস্থিরতা স্পর্শ করবে ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাককে।

বিশ্ব বাণিজ্যে নেমে আসবে বড়ো ধরনের ধস। মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর ঢল সইতে হবে বিশ্বকে। এছাড়া ইরাক ও সিরিয়া যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরা বিশ্বের আর কোনো যুদ্ধের ভার নেওয়ার সক্ষমতা নেই। অন্যদিকে ব্যর্থ আরব বসন্তের পর অস্থিরতায় ভুগছে তেল সমৃদ্ধ আরেক দেশ লিবিয়া।

ফলে বিশ্ব শান্তি, মানবতা ও বাণিজ্যের স্বার্থে যে কোনো ধরনের যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়