‘মুজিববর্ষে’ সহনশীলতার প্রত্যয় দৃঢ় করার প্রত্যাশা জানাচ্ছি। কারণ বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জঙ্গিবাদের উত্থান, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক অসাম্যের মধ্যে সহনশীলতার আলাদা তাত্পর্য রয়েছে। সহনশীলতা হলো এক ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তা অন্য মানুষের অবাধ ও অধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। সমাজে নানামুখী অসংগতির কারণে মানুষ সহনশীল থাকতে পারছেন না। মূল্যবোধের অভাবেও মানুষ অধৈর্য হয়ে নানা ধরনের অন্যায়-অনিয়মে লিপ্ত হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এক প্রস্তাবে বিভিন্ন দেশের সরকারকে আন্তর্জাতিক সহনশীলতা দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়। লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও প্রচারসহ বিভিন্ন উপায়ে সহনশীলতার নানান দিক সবার কাছে তুলে ধরা। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে ইউনেস্কোর ২৮তম অধিবেশনে ‘সহনশীলতার মৌলিক নীতি ঘোষণা’ গৃহীত হয়। এর লক্ষ্য হচ্ছে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ভেতর সহনশীলতা শিক্ষার মাধ্যমে পৃথিবীর সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষের সুষম ও শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন নিশ্চিত করা।
‘মুজিববর্ষে’ সহনশীলতার মূল কথার সূত্র ধরে বলতে হয়, অশান্ত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় বিভেদ ভুলে একত্রে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের। ধর্মে ধর্মে বিভেদের পরিবর্তে সম্প্রীতি ও শোষণমুক্ত সুষম সমাজ; অসত্য অমঙ্গল অকল্যাণের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে দেশের মঙ্গল কামনায় উজ্জীবিত হতে হবে। একত্রে গাইতে হবে জীবনের জয়গান, মতামত ব্যক্ত করতে হবে সাম্প্রদায়িক হানাহানি মুক্ত সুন্দর সমাজ সৃজনের পক্ষে। উগ্রবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সর্বধর্ম সম্প্রদায়ের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে জাগ্রত করতে হলে পারস্পরিক সৌহার্দ তথা সহনশীলতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। প্রত্যেক ধর্মের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন মানুষ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ সম্প্রীতি প্রত্যাশা করেন। আর এর জন্য দরকার সহনশীল আচরণ। এই সহনশীলতার অর্থ ধৈর্য, সহ্য, সহিষ্ণুতা, সহনীয়তা, ক্ষমাশীলতা প্রভৃতি। পবিত্র ধর্ম গ্রন্থগুলোতেও বলা হয়েছে ধৈর্য বা সহনশীলতা প্রদর্শন করতে এবং সৃষ্টিকর্তার সাহায্য চাইতে। যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করেন তারাই মহান। প্রকৃতপক্ষে মানবধর্মের কথার মধ্যেই আছে সহনশীলতার মৌল ভিত্তি। মানবতা, বহুমাত্রিক ঐতিহ্য-পরম্পরা, বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সাম্যচিন্তা আমাদের এশিয়ার সমাজব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার জন্য দরকার সামাজিক স্থিতিশীলতা। অসহিষ্ণু পৃথিবীর ধর্মীয় মৌলবাদিতা দূর করার জন্য মানুষে মানুষে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। আর এর জন্যই দরকার বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সহনশীলতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের এই ভূখণ্ডে একত্র হয়েছে বহু ধর্ম, এখানে পাশাপাশি বাস করেন নানা ধর্মাবলম্বী মানুষ। একের মধ্যে বহুর অস্তিত্ব আমাদের সমাজের মতো পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চলে নেই।
সহনশীলতা বা পরমতসহিষ্ণুতা সব ধর্মের আহ্বান হলেও, একদল মানুষ সব সময়ই এর বিপক্ষে আছেন। যারা প্রচলিত ধর্ম পালন করেন, তারাও এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন—এমন কথা বলা যাবে না। যারা প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাস করেন না বলে আত্মম্ভরী ঘোষণা দেন, তারাও এক্ষেত্রে শান্তি ও মৈত্রীর কোনো বাতাবরণ নির্মাণ করতে সক্ষম হননি। ফলে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ সর্বদা লেগেই আছে। ধর্মীয় মৌলবাদীরা এই সুযোগটা গভীরভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগিয়ে সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব ও বিরোধটাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজের এই অপপ্রবণতা তথা অপশক্তির বিরুদ্ধে শুভ বোধ জাগ্রত করার জন্য সহনশীলতার অনুশীলন একান্ত প্রয়োজন। সুতরাং বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি কামনার জন্যই আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে। মানুষের কল্যাণ, সমাজের মঙ্গলচিন্তা হবে মুখ্য। তাই হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সব মানুষের কল্যাণ কামনা আমাদের মুখ্য লক্ষ্য হওয়া উচিত। এজন্য কাজী নজরুল বলেছিলেন, “অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি ক্রীশ্চানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি,— আলোর মতো, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তেরা বললে, কৃষ্ণ হিন্দুর; মুসলমানের ভক্তেরা বললে, মুহম্মদ মুসলমানের; খ্রীষ্টের শিষ্যেরা বললে খ্রীষ্ট ক্রীশ্চানদের। কৃষ্ণ-মুহাম্মদ-খ্রীষ্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি। আর এই সম্পত্তি নিয়েই যত বিপত্তি। আলো নিয়ে কখনো ঝগড়া করে না মানুষে, কিন্তু গরু-ছাগল নিয়ে করে।” অর্থাত্ ধর্মের নামে বিশ্ব জুড়ে সহিংসতার অবসান-কল্পে মানবতার ওপর জোর দিতে হবে। আর ধর্মীয় জীবনে বিশ্বাসীদের মানবিক বিকাশে সহনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি। দায়বদ্ধতা, সাহস ও উদারতা দিয়ে বাঙালি সমাজে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব। ধর্মের ভিন্নতা ঈশ্বরেরই দান এবং সেই পরিচয় সবাই মেনে নিয়েই বেঁচে থাকে। ভিন্নতার মধ্যে ঐক্যের সুর বাজে প্রাণে। হিন্দুধর্মের মৌল ভিত্তিতে ক্রিয়াশীল আছে সহনশীলতার বাণী; কবির-নানক-বুদ্ধের দর্শনেও আছে মানবমৈত্রীর কথা। পশ্চিম এশিয়ায় উদ্ভূত ইসলাম ও খ্রিষ্ট্রধর্মও তো মানুষের সঙ্গে মানুষের মৈত্রীর কথা বলেছে। ইসলাম ধর্মের ‘লা কুম দিনুকুম ওয়ালিয়া দিন’, হিন্দুধর্মের ‘সর্বে ভবন্তু সুখিন, সর্বে সন্তু নিরাময়া, সর্বে ভদ্রানি পশ্যান্তি, মা কস্ফচিত্ দুঃখভাগভবেত’; বৌদ্ধধর্মের ‘সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্তু’র মৌল বাণী যে অভিন্ন তা সহজেই অনুধাবনীয়। খ্রিষ্টধর্মেও আছে প্রায় অভিন্ন কথা— ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।’ এসব কথা মানবপ্রীতিরই স্মারক।
সহনশীলতা একটি সামাজিক মূল্যবোধ। এটি লালন করলে রাষ্ট্রীয় জীবনে হানাহানি বন্ধ করা সম্ভব। ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণ, বিচিত্র বিশ্বাসীদের একত্রে বসতি, সামাজিক সংহতি ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠার জন্যও সহনশীলতার চর্চা দরকার। বিশ্বে বর্ণ এবং সাংস্কৃতিক, জাতিগত বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত করছে অপরাজনীতি—অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে মারাত্মকভাবে। আর এসব অপব্যাধি দূর করার জন্য ‘মুজিববর্ষে’ গুরুত্বের সঙ্গে সহনশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন। তবে আমাদের সমাজে সহনশীলতার ধারণাটি শতাব্দীপরম্পরায় গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। এখানে মনুষ্যত্ববোধ তথা মানবধর্ম অসাম্প্রদায়িক চেতনারও মূল কথা। কারণ এখানে সমাজের প্রত্যেক মানুষের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক ভেদাভেদ ভুলে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায়ের জীবনাচারের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
