কাজ ছোটো, কিন্তু ব্যয় অবিশ্বাস্য বড়ো। হিসাবের পুরো চিত্রই বলে দিচ্ছে লুটপাটের সুনামি। এছাড়া কোথাও নামেমাত্র কাজ হয়েছে। আবার কোথাও কাজের অস্তিত্বই নেই। গায়েবি এসব কাজের বিপরীতে বিল উত্তোলন করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন এসব কাজের নথি রেলভবন থেকে জব্দ করে অনুসন্ধান করছে।
নথি সূত্রে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে বহু কাজ টেন্ডার ছাড়াই পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের তৃতীয় শ্রেণির ঠিকাদার। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানা হয়নি। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এসব দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হওয়ায় পশ্চিম রেলওয়েতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতির এ সিরিজ প্যাকেজে রয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। পশ্চিম রেলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রমজান আলী ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েক কর্মকর্তা সিন্ডিকেট দুর্নীতির এ মহাযজ্ঞের নেতৃত্বে ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র মতে, একটা ছোটো অফিসের টয়লেট মেরামত করে এক ঠিকাদার বিল নিয়েছেন প্রায় ২৮ লাখ টাকা। বারান্দার টিন বদল ও অফিসের টয়লেট মেরামত করে আরেক ঠিকাদার বিল নিয়েছেন ৭৩ লাখ টাকা।
অভিযোগ উঠেছে, পশ্চিম রেলের এমন দুই শতাধিক গায়েবি খাতে ৭০০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। বিভিন্ন স্টেশন রং করা, লাইন সংস্কার, রেলসেতু রং করা, টয়লেট মেরামত, ছাউনি-প্ল্যাটফরমের টিন বদল, স্টেশন প্রাঙ্গণ সংস্কার, ওভারব্রিজ সংস্কার, মাটি ভরাট, জেটি সংস্কার, হাঁটাপথ সংস্কার, দরজা মেরামত, শীত ও গরমের পোশাক ক্রয়, স্যানিটারি উপকরণ ও ভিম পাউডার ক্রয়, সেতু মেরামত, বাউন্ডারি ওয়াল মেরামতের ছোটো কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। রাজশাহী রেলভবনে এসএসএই দপ্তরের বারান্দার টিন পরিবর্তন ও একটি টয়লেট সংস্কারকাজে ৭২ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ রাজশাহীতে রেলের এ দপ্তরটি একটি ছোট্ট টিনশেড অফিস। ২০১৭ সালের ৭ জুলাই এই কার্যাদেশ পায় ‘মোমিন ট্রেডার্স’। বিধিবদ্ধ দরপত্র ছাড়াই তৃতীয় শ্রেণির ওই প্রতিষ্ঠান লোকাল টেন্ডার মেথডে (এলটিএম) প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজটি পায়। একই বছরের ১ অক্টোবর ঠিকাদারকে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়।
এদিকে পশ্চিম রেলের টেলিযোগাযোগ ও সংকেত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের টয়লেট মেরামতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ লাখ টাকা। এ কাজটি করেছে তৃতীয় শ্রেণির ঠিকাদার ‘তোফা কন্সট্রাকশন’। রাজশাহীতে রেল অফিসার্স মেসের একটি কক্ষের (ইসি-৪) মেরামত ও মেসের ভেতরের হাঁটাপথ সংস্কারে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮৯ লাখ ৪৮ হাজার ৭৮০ টাকা। ‘সরকার অ্যান্ড ব্রাদার্স’ কাজটি করেছে। রাজশাহীর ভদ্রা ব্যারাকের পুকুরপাড় উন্নয়ন ও ওয়াশপিট (ট্রেন ধোয়ার শেড) সম্প্রসারণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৪ লাখ ৯ হাজার টাকা। ‘আশরাফুল কবির’ নামের প্রতিষ্ঠান কাজটি করে। তবে সরজমিনে পুকুরপাড় উন্নয়নের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন কয়েক বছর আগে রি-মডেলিং হলেও জরুরি উল্লেখ করে স্টেশনের বুকিং কাউন্টার, প্রতীক্ষালয় ও কার পার্কিং এরিয়া মেরামতে ঠিকাদার ‘আনোয়ারুল ইসলাম বাবু’ ৫৭ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৪ টাকা বিল পেয়েছেন। অন্যদিকে উল্লাপাড়া স্টেশনের ইয়ার্ডে বালু ভরাট দেখিয়ে মোল্লাহ কন্সট্রাকশনকে ৭৩ লাখ ৪৮ হাজার ৯৩৯ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জের রায়পুর স্টেশনে মালামাল ওঠানামার সুবিধা সম্প্রসারণে ঠিকাদার ‘আরটিসি’ ৯৭ লাখ ১৮ হাজার টাকা বিল পেয়েছে।
রেলের সাবেক ডিজি আমজাদ হোসেনের শ্যালক পরিচয়দানকারী বদরুল আলম নাটোর, মাধনগর, আত্রাই ও সান্তাহার স্টেশনে রেললাইনের প্লাস্টিকের ওয়াসার সরবরাহ কাজে ৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার টাকার ৫টি প্যাকেজের কাজ পেয়েছেন টেন্ডার ছাড়াই। বদরুল গত আড়াই বছরে এভাবে বিনা টেন্ডারে প্রায় ১০০ কোটি টাকার কাজ করেছেন। কাজ শুরুর আগেই বদরুল বিলও পেয়েছেন বলে রেলওয়ের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে বদরুল আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে রেলের সাবেক ডিজি আমজাদ হোসেন বলেন, বদরুল তার শ্যালক নয়; এলাকায় বাড়ি। তার প্রভাব খাঁটিয়ে কাজ নেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
একই সময়ে টেন্ডার ছাড়াই ঢাকার ‘আরটিসি’ বিভিন্ন রেললাইন সংস্কারের ১৯টি কাজ পায়। এসব কাজ বাবদ তিনি প্রায় ২৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বিল পান। কোথায় কীভাবে কাজ হয়েছে? বিল-ভাউচারের নথিতে কোনো বিবরণ নেই। ২০১৮ সালের ১৮ মার্চে ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন প্ল্যাটফর্মের ২০০ ফুট সিআই সিট পরিবর্তনসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য ঠিকাদারকে ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ টাকার বিল দেওয়া হয়। ফরমাল টেন্ডার ছাড়াই উল্লাপাড়া স্টেশনের ৩০০ ফুট সিআই সিট পরিবর্তনের জন্য ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
