কয়দিন আগে আমি শিশু চলচ্চিত্র উত্সবের সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছিলাম। এর আয়োজক ‘চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি বাংলাদেশ’ এবং আমি এই সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট—কাজেই আমাকে যেতেই হবে। ঢাকা শহরের ভেতরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়াটি এক সময় কঠিন ছিল, এখন সেটা ‘কঠিন’ স্তর পার হয়ে কপাল স্তরে পৌঁছে গেছে। অর্থাত্ যত প্রস্তুতি নিয়েই রওয়ানা দেওয়া হোক না কেন শুধু কপালে থাকলে ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে। এই দিনটিতে আমার কপাল ভালো ছিল এবং আমি ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পেরেছি।
সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে গিয়ে আমি পেছনে আমাদের ব্যানারটির দিকে তাকিয়ে একটু চমকে উঠলাম। আমি জানি বেশ অনেকদিন থেকে এই চলচ্চিত্র উত্সবটির আয়োজন করা হচ্ছে; কিন্তু আমি হঠাত্ নতুন করে অনুভব করলাম যে, এটি ১৩তম শিশু চলচ্চিত্র উত্সব। অর্থাত্ এর আগে একবার নয়, দুইবার নয় এক ডজনবার এই উত্সবটির আয়োজন করা হয়েছে। কী অসাধারণ একটি ব্যাপার।
এই চলচ্চিত্র উত্সবটি যে আসলেই অসাধারণ একটি ব্যাপার তার অনেক কারণ আছে। প্রথম কারণ এটি শিশুদের জন্য। আমাদের দেশে শিশুদের জন্য কোচিং সেন্টার ছাড়া আর কী আছে? স্কুল শেষ করার পর ছেলেমেয়েদের দিন শেষ হয় না, তারা একটার পর একটা কোচিং সেন্টারে যেতে থাকে। সেই শিশুদের কথা স্মরণে রেখে শুধু শিশুদের জন্য যদি চলচ্চিত্র উত্সবের আয়োজন করা হয় তাকে অসাধারণ তো বলতেই পারি!
দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে—এটি একটি আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সব। জোড়াতালি দেওয়া আন্তর্জাতিক উত্সব নয়, সত্যিকারের আন্তর্জাতিক উত্সব। এইবার দুই তিনটি নয়, ৩৯টি দেশের ১৭৯টি চলচ্চিত্র এই উত্সবে দেখানো হবে। ছোটো একটা ঘরে অল্পকয়জন বসে ছবি দেখবে না, পাঁচটি ভেন্যুতে একই সঙ্গে সেই সকাল ১১টায় শুরু করে একেবারে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটার পর একটা ছবি দেখানো হবে। অভিভাবকসহ শিশু-কিশোর সবার জন্য উন্মুক্ত। বড়ো বড়ো দোতলা বাসে করে স্কুল থেকে ছেলেমেয়েদের আনা-নেওয়া করা হবে, বাবা-মায়েরা তাদের শিশু সন্তানের হাত ধরে ছবি দেখতে আসবেন। এই ২৪ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ শিশু-কিশোরদের জন্য একটি আনন্দ মেলা হয়ে থাকার কথা। বিশ্বাস না করলে যে কেউ এসে নিজের চোখে যাচাই করে যেতে পারে।
আমার খুব সৌভাগ্য আমি এই দেশের শিশু-কিশোরদের অনেক আয়োজনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এই ধরনের সবকয়টি আয়োজনে আমি সবসময়ে লক্ষ্য করেছি—একটি নির্দিষ্ট বিষয় মাথায় নিয়ে আমরা কিছু একটা আয়োজন করি; কিন্তু দেখতে দেখতে বিষয়টির ডালপালা গজাতে থাকে এবং আমরা যেটা করতে শুরু করেছি তার বাইরেও অনেক কিছু করার সুযোগ পেতে থাকি। শিশু চলচ্চিত্র উত্সবেও ঠিক সেই ব্যাপারটি ঘটেছে। শুরুতে ছেলেমেয়েদের সারা পৃথিবীর সর্বশেষ এবং অসাধারণ চলচ্চিত্র দেখানো শুরু হয়েছিল; কিন্তু এখন শুধু সেই বিনোদনের মধ্যে এটা আটকে নেই। এই চলচ্চিত্র উত্সবকে ঘিরে ছেলেমেয়েরা নিজেরাই চলচ্চিত্র তৈরি করতে শুরু করেছে। এই শিশু চলচ্চিত্র উত্সবটিকে একটি অসাধারণ উত্সব বলার এটি আরেকটি কারণ।
তবে এই চলচ্চিত্র উত্সবটি থেকে আমার সবচেয়ে বড়ো পাওয়া অন্য জায়গায়। আমি সারাজীবন যেটি বিশ্বাস করে এসেছি এখানে ঠিক সেটি ঘটতে দেখছি। আমি আমার জীবনে সবসময়ে দেখে এসেছি যে, যদি খুব বড়ো একটা কাজ করতে হয় তাহলে সেটি করতে হয় ভলান্টিয়ারদের দিয়ে। টাকা খরচ করে অনেক কিছু করা যায়; কিন্তু সেই কাজে হূদয়ের স্পর্শ থাকে না বলে এক জায়গায় এসে থেমে যায়। ভলান্টিয়ারদের কাজ কোথাও থেমে যায় না সেটা এগোতেই থাকে, এগোতেই থাকে।
২.
এতক্ষণ শিশু চলচ্চিত্র উত্সব নিয়ে কিছু আনন্দের কথা বলেছি, এখন ছোটোখাটো কয়েকটা দুঃখের কথা বলি! সংবাদ সম্মেলনে আমরা ঘোষণা করে বলেছি যে, আয়োজনের ব্যাপকতার দিক দিয়ে আমাদের এই শিশু চলচ্চিত্র উত্সবটি সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো একটি শিশু চলচ্চিত্র উত্সব। যারা অবিশ্বাসের সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ফেলেছেন তাদেরকে আমি খোঁজখবর নিতে বলব। যে সংখ্যক শিশু-কিশোর এই উত্সবে যোগ দেয় এবং এই উত্সবে তারা যে ধরনের সৃজনশীল কাজকর্মে যুক্ত থাকে সারা পৃথিবীতে তার কাছাকাছি উত্সব বলতে গেলে নেই।
এই দেশে টানা ১৩ বছর থেকে এই অসাধারণ একটি উত্সবের আয়োজন করে আসার পরও প্রতি বছর আমাদের মাথা চুলকাতে হয়, দুশ্চিন্তা করতে হয়, লজ্জার মাথা খেয়ে নানা প্রতিষ্ঠানের সামনে কাচুমাচু করে যেতে হয় এই উদ্যোগটির জন্য প্রয়োজনীয় খরচের টাকা তোলার জন্য! আমাদের চোখের সামনে আমরা যতগুলো শিল্পমাধ্যম দেখি তার মধ্যে চলচ্চিত্র নিঃসন্দেহে সবচেয়ে চমকপ্রদ। তার কারণ ভালো একটা চলচ্চিত্র তৈরি করতে হলে তার জন্য প্রথমেই দরকার একটি অসাধারণ গল্প বা কাহিনি, খুব ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্যামেরাম্যান, চমত্কার একজন ডিরেক্টর, আবহসংগীত এবং সবশেষে প্রযুক্তিগত কাজ। এত কিছু মিলিয়ে যখন এই শিল্প মাধ্যমটি তৈরি হয় তখন নিঃসন্দেহে সেটি হয় বিনোদন কিংবা মানসিক বিকাশের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ। শিশু-কিশোরদের মাথায় রেখে আলাদাভাবে সেই বিনোদনটির জন্য আমরা যখন উত্সবের আয়োজন করি তখন আমাদের সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসে না—সেই দুঃখটি আমি মেনে নিতে পারি না।
ভাগ্যিস আমাদের দেশের অর্থ মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের এবং মন্ত্রী মহোদয়ের এই দেশের শিশুদের জন্য মায়া আছে। তারা সাহায্য না করলে আমরা কীভাবে এই উত্সবের আয়োজন করতাম আমরা নিজেরা ভেবে পাই না। দুটি মন্ত্রণালয় ছাড়া এই দেশের শিশুদের জন্য এখনো যাদের মায়া আছে তাদের মধ্যে রয়েছে শিল্পকলা একাডেমি, এশিয়াটিক এক্সপো এবং দীপ্ত টিভি। এই দেশের শিশু-কিশোরদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য কৃতজ্ঞতা। তবে কৃতজ্ঞতা যদি জানাতেই হয় সবার আগে কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম এবং আলোকচিত্র শিল্পী সুন্নী মোরশেদকে। ছোটো শিশুদের সংগঠিত করে কীভাবে তাদের দিয়ে অনেক বড়ো কাজ করে ফেলা যায় সেটি তাদের মতো করে কেউ জানে না।
আমি যে পত্রপত্রিকা এবং পোর্টালগুলোতে আমাদের নিজেদের কাজকর্মের কথাই একটু বড়ো গলায় বলার চেষ্টা করছি তার পিছনেও একটা দুঃখের কাহিনি আছে। এত যত্ন করে সংবাদ সম্মেলন করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো একটি শিশু চলচ্চিত্র উত্সবের আয়োজনটির কথা সবাইকে জানানোর পরও আমরা অবাক হয়ে দেখি পত্রপত্রিকায় তার কোনো উল্লেখ নেই! আজকাল সংবাদপত্রগুলোও মনে হয় খানিকটা স্বার্থপরের মতো। তারা যেখানে নিজেরা যুক্ত থাকে তার বাইরের খবরগুলো ছাপাতে আগ্রহী হয় না। সংবাদপত্রগুলো যদি শুধু নিজেদের খবরই ছাপবে, তাহলে আমরা তাদেরকে জাতীয় সংবাদপত্র কেন বলি?
n লেখক :সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ
