পরিণত বয়সে এসেও চপল কিশোর

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২০, ২২:০৩

বয়সেই তারা সবাই ছিলেন ষাটোর্ধ্ব। কিন্তু কর্মকাণ্ড আর আচরণে সেদিন হয়ে  উঠেছিলেন তারা দুরন্ত আর ডানপিটে, ঠিক স্কুলছাত্রের মতোই। প্রাণ খুলে হাসছেন, গলা ছেড়ে গান গাইছেন, আবার নাচ করছিলেন, প্রতিটি মুহূর্তে ভাসছিলেন প্রাণের জোয়ারে আর আনন্দের বন্যায়। বলছিলাম চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ৭৩ ব্যাচের ছাত্রদের কথা, তাদের প্রথম পুনর্মিলনীর কথা। আজ  ৫২  বছর পরে এসে তারা যখন সবাই একই কাতারে এসে দাঁড়ালেন, যেন তারা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছিলেন। প্রত্যেকের চোখে মুখে ছিল যেন কী একটা পাওয়ার আনন্দ, শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলো সিনেমার পর্দার মতো বুঝি বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল তাদের ল্যান্ডস্ক্যাপে। স্বনামে খ্যাত  ডাক্তার, নামকরা  ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা সরকারের আমলা, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউবা শিল্পী, কেউবা কবি সাহিত্যিক, কেউ আলোকচিত্রী,  কেউবা  বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপদে দায়িত্ব পালন করেছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবদান রেখেছেন।  চট্টগ্রামের বাসিন্দারা তো ছিলেন, এসেছেন ঢাকা থেকে, এসেছেন  সুদূর আমেরিকা থেকে, সোলসের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট সেতার শিল্পী সাজেদুল আলম এসেছেন স্পেন থেকে, তার বিদেশিনী স্ত্রী দুলসে ম্যাগ্রোকে নিয়ে। সেও পুরো সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আয়োজকদের প্রণোদনা দিয়েছে। চমত্কার অনুভূতি ব্যক্ত করেছে ভাঙা ভাঙা বাংলায়। কলেজিয়েটস ৭৩ ব্যাচের ছাত্র বিশিষ্ট আলোকচিত্রী মউদুদুল আলমের  সহধর্মিণী হিসেবে উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ১৯৭৩  সালে তারা ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাদের পুনর্মিলন উপলক্ষ্যে গত ১০ জানুয়ারি নগরীর সিনিয়রস ক্লাবে বসেছিল চট্টগ্রাম কলেজিয়েটস ৭৩ ব্যাচের মিলনমেলা। ‘বন্ধুত্ব জয় করুক অমরতা’ শীর্ষক  একেবারেই অনাড়ম্বর  অথচ অত্যন্ত আন্তরিক দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানটি একটুও ঝিমিয়ে পড়েনি, কোনো ক্লান্তি কিংবা বিরক্তির ছিটেফোঁটা ছিল না, টানা আনন্দ আর  উচ্ছ্বাসেই এই ষাটোর্ধ্ব খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বগুলো রাত ১১টায়ও  ডুবেছিল  অন্যরকম এক আনন্দযজ্ঞে। সারা দিনের এই আনন্দ আড্ডায় থেমে ছিল না ফটোসেশন। প্রতিটি ক্ষণ আর মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি হয় অ্যান্ড্রয়েড ফোনের কল্যাণে। কেবল ক্যামেরাবন্দি  করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, সঙ্গে  সঙ্গে তা ছেড়ে দিচ্ছেন ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে কিংবা ইমুতে। যারা আসতে পারেননি, তারা যেন সরাসরি অনুষ্ঠানের আমেজ কিছুটা হলেও উপভোগ করতে পারেন। সকালেই উদ্বোধনী পর্ব, ফেলোশিপ, আড্ডা, জুমা বিরতি এবং বাংলা খাবার, অর্থাত্ সাদা ভাত, ডাল ডিম, সালাদ, ফ্রেশ ভাজা মাছ, চিকেন আর ফিরনি দিয়ে ভূরিভোজ। এরপর কলেজিয়েট স্কুল ক্যাম্পাস ভিজিট। এই অবসরে উপস্থিত সহধর্মিণীরা মেতে উঠে জম্পেশ আড্ডা আর গানে। আইভি হাসান, রূপালী বড়ুয়া, নিগার সুলতানা, জেসমিন সুলতানার সঙ্গে বিদেশিনী দুলসে ম্যাগ্রো ও সমবেত কণ্ঠে একের পর এক রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে মুগ্ধতার রেশ ছড়ান। তাদের গানে গানে এক মায়াবী পরিবেশ বিরাজ করে মিলনায়তন জুড়ে। এরই ফাঁকে গরম গরম কফি আর চা, একদিকে চিপস, ঝাল ঝাল পেঁয়াজু, কাঠ বাদাম, আলুবোখরা, চকোলেট অন্যদিকে ছাচ পাক্কন, দুধচিতই অরি ক্ষীর পাটিসাপটা রসনায় যোগ করে ভিন্ন এক আমেজ। স্মৃতিচারণ পর্বে সতীর্থরা স্কুলজীবনের নানান স্মৃতি অত্যন্ত মজা করেই রোমন্থন করেন। তারা প্রয়াত  শিক্ষক  ও সতীর্থদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর শুরু হয় আমন্ত্রিত শিল্পীদের পরিবেশনা। এই পর্বে শিল্পী রনি ও ঋতু বড়ুয়া হারানো দিনের গান পরিবেশন করে অনুষ্ঠানকে জমজমাট করে তুলে। শিল্পীদ্বয় কোনো ধুমধাড়াক্কা গানের  দিকে যাননি, ৭৩ ব্যাচের ছাত্রদের মেজাজ বুঝেই তাদের উপযোগী গান গেয়ে অনুষ্ঠান মাতান তারা। স্পেন থেকে আগত সোলসের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী সাজেদুল আলম মাইজভাণ্ডারী গান ও সোলসের কিছু গান পরিবেশন করেন।  গানের ফাঁকে ফাঁকে র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠানে দান করে বাড়তি পূর্ণতা। নৈশভোজে  চিকেন পোলাও, জালি কাবাব, খাসির রেজালা আর দই খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন। রাত বাড়তে থাকে, এবার বাড়ি ফেরার পালা। কিন্তু ঘরে ফেরার যেন কারো তাড়া নেই। অবশেষে ভাঙল মিলনমেলা। সতীর্থরা ফিরে যাচ্ছেন নিজস্ব আলয়ে। যেন গুনগুন করে গাইছেন রবীন্দ্রনাথের সেই গান ‘শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে/ শেষ কথা যাও বলে’।

n লেখক :সাংবাদিক, চট্টগ্রাম