ধাঁধা লোকসাহিত্যের অত্যন্ত প্রাচীন শাখা। প্রায় ধাঁধার মধ্যেই চমত্কার ছন্দ ও বিষয়বস্তুরও সাক্ষাত্ পাওয়া যায়। ধাঁধা যে একটি বিশ্বব্যাপী সম্পদ তা ইংরেজি ‘Riddle’ বা ‘Enigma’ শব্দটি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। ল্যাটিন ‘Aenigma’ ফরাসি ‘Enigme’ এবং ইংরেজি ‘Enigma’ গ্রিক শব্দমূল থেকে গৃহীত। সংস্কৃতে যা ‘প্রহেলিকা’ আধুনিক উর্দুতে তা ‘পহেলিয়া’ এবং বাংলায় ‘হেঁয়ালি’। ব্লুমফিল্ডের মতে, সহজ সরল আদিম সমাজে ধাঁধার জন্ম হয়েছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা জটিল হয়ে চলেছে। বাইবেলে যে সব ধাঁধা দেখা যায় তা বেশ দীর্ঘ। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রচলিত ধাঁধাগুলি সংক্ষিপ্ত। আমেরিকান লোকবিজ্ঞানী টেলর প্রমাণ করেছেন যে হিব্রু ধর্মগ্রন্থে চীনাভাষায় এবং অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার অধিবাসীদের মধ্যে প্রচুর ধাঁধার নমুনা আছে।
ধাঁধার ব্যবহার আমাদের দেশে অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ ঋকবেদে ধাঁধার নিদর্শন আছে। অনেক ধাঁধা লোকঐতিহ্য থেকেই ধর্মানুষ্ঠানে প্রবেশ করেছে। ফেরদৌসীর শাহনামা গ্রন্থেও ধাঁধার পরিচয় মেলে। সবচেয়ে প্রাচীন ধাঁধার সন্ধান পাওয়া যায় গ্রিসে। খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে গ্রিক মহাকবি হোমার রাজসভায় ‘জোঁক’ সম্বন্ধীয় একটি ধাঁধার উত্তর দিতে না পারায় লজ্জিত ও জীবনে বিতৃষ্ণ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আরব দেশের হাজী খলিফা কর্তৃক লিখিত চর্তুদশ শতকের পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায় যে আরবেও উত্কৃষ্ট ধাঁধা তৈরি হয়েছিল। বসরা অঞ্চলের আল-হারিরী তাঁর ধাঁধার জন্য সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছিলেন। এছাড়াও আরব্য উপন্যাস, ইহুদিদের গ্রন্থ, বাইবেল, পারস্য সাহিত্যে ফেরদৌসীর ‘জাল’ ও আরব্য সাহিত্যের বাদশাহ সোলায়মান ও রানি বিলকিসের ধাঁধা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্কৃত সাহিত্যে বিশেষ করে বেতাল পঞ্চবিংশতি গ্রন্থে, আরব্য উপন্যাসে, প্রাকৃত সাহিত্যে সুদীর্ঘ কাহিনির আকারেও ধাঁধা সাহিত্য পাওয়া যায়।
অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদেও বহুসংখ্যক হেঁয়ালি বা প্রচ্ছন্ন প্রশ্নের দেখা পাওয়া যায়—‘দুহি দুহি পীঢ়া ধরন ন জাই/রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই/দিবসহি বহুড়ী কাউহি ডর ভাই/রাতি ভইলে কামরু জাই।’ উন্নত ধরনের সাহিত্যিক ধাঁধার অজস্র দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরামের ‘চণ্ডিমঙ্গল’ অথবা ঘনরামের ‘ধর্মমঙ্গল’ গ্রন্থে। লৌকিক ধাঁধা ও তার উত্তর সবই লোকঐতিহ্যেই রয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে বহু ধাঁধা আমাদের দেশে যেমন এসেছে তেমনি করে আমাদের দেশের বহু ধাঁধা অন্যত্র ছড়িয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি কর্তৃক দেশ দখল, পঞ্চদশ শতক থেকে দেশের নানা অংশে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও ফরাসিদের আগমন এবং অবশেষে অষ্টাদশ শতক থেকে একটানা দুই শ বছরের ইংরেজ শাসন আমাদের ঐতিহ্যকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ও অন্য বহু ধর্মাবলম্বী বিচিত্র বিপুল জনস্রোতের নানা ঐতিহ্য আমাদের মনের ক্ষেত্রকে নানা সম্ভারে পূর্ণ করে তুলেছে। ধাঁধা কখনো কখনো অপূর্ব কাব্যসৌন্দর্য ও চিত্র-মাধুর্যপূর্ণ হয়। আমাদের দেশে প্রচলিত ধাঁধাগুলি আজো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
