থিসিস পেপার তৈরির সময় যে সব বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৪:১২

থিসিস নিয়ে নবীন গবেষকদের মধ্যে একরকম ভীতি কাজ করে। বিশেষ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক লেভেল থেকেই গবেষণা সবার জন্য বাধ্যতামূলক তাদের বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ফলাফল বের করা পর্যন্ত নানা রকম বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুধু তাই নয়, কীভাবে কাজ শুরু করবে, কোন কাজের পর কোনটা করতে হবে তা নিয়ে চিন্তা করতে করতেই অনেক গবেষকের এক-দেড় মাস সময় চলে যায়। তবে একটু ধারণা থাকলে থিসিস পেপার লেখা কোন জটিল বিষয় না। থিসিসের মতো বড় স্কেলের প্রজেক্ট শেষ করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত সময়, ধৈর্য, প্রচুর পড়াশোনা এবং পরিশ্রম। তবে ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। সঠিক সময় কাজ শুরু করলে, সব কিছু সুসংগঠিত করে রাখলে, গবেষণার টপিক নিয়ে পড়াশোনা করলে ও প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নোট করে রাখলে, আপনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপনার থিসিসের কাজ শেষ করতে পারবেন।

প্রথমেই চলুন জেনে নেই থিসিস কি? থিসিস পেপার একটি বিস্তৃত গবেষণা পত্র যা সাধারণত একজন থিসিস সুপারভাইজার এর পরামর্শে লেখা হয়। থিসিস এমন একটি একাডেমিক ধারণা যা কোনও বিষয়ে লেখকের অবস্থানকে প্রকাশ করে। অন্য কথায়, আপনি যদি মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে লিখছেন তবে আপনি আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটি সামনে রেখে বলবেন এবং আপনার অবস্থানের প্রতিরক্ষায় আপনি যে যুক্তি তুলে ধরবেন তা উপস্থাপন করবেন। একটি পরিষ্কার, নির্বিঘ্নিত থিসিস আপনার বিশ্বাসগুলির প্রতি শক্তি এবং আস্থা প্রদর্শন করে। একটি একাডেমিক ডিগ্রির জন্য একটাই থিসিস লেখা হয়, সুতরাং থিসিস পেপার এমনভাবে লেখা উচিত যেন নিজের থিসিসটা হাতে নিয়ে আপনি নিজে গর্ব করতে পারেন। একটি থিসিস কয়েকটি ছোট গল্পের সমাহার নয়, বরং এটি একটি উপন্যাস, সুতরাং একটি অনুচ্ছেদের সাথে অন্য অনুচ্ছেদের, আগের অধ্যায়ের সাথে পরের অধ্যায়ের সংযোগ থাকাটা অত্যাবশ্যকীয়।

থিসিস পেপার শুরু করার আগে জানতে হবে কোন ক্ষেত্রের উপরে আপনি গবেষণা করবেন। এক্ষেত্রে সুপারভাইজারের সহযোগিতা নিতে পারেন অথবা নিজের আগ্রহের ক্ষেত্রকে থিসিসের জন্য বেছে নিতে পারেন। বিষয় বা ক্ষেত্র ঠিক করার পরের কাজ হলো টপিক নির্ধারণ করা। থিসিসের টপিক খুঁজে বের করা বেশ কঠিন একটা কাজ। বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে ঘাটাঘাটি করে টপিক ঠিক করতে হয়। টপিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হচ্ছে থিসিসের ক্ষেত্র নিয়ে ভালো ধারণা নেওয়া। এই ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের সহযোগিতা নিতে পারেন। ভালো করে ইন্টারনেট, বই, রিসার্চ পেপার ঘেঁটে তারপর টপিক নির্ধারণ করা উচিৎ।

স্নাতক লেভেলে গবেষণার সময় শিক্ষার্থীরা যে ভুলগুলি করে সেগুলির মধ্যে একটি হল অনেক শিক্ষার্থীই তাদের বিষয় ছোট করে নেয়ার আগেই লেখা শুরু করেন, ফলে একটা সময়ে তারা বুঝতে পারেন যে এতো বড় টপিক নিয়ে গবেষণা করাটা তাদের পক্ষে মাত্র ছয় মাস বা এক বছরে সম্ভব না। অভিজ্ঞতা ছাড়া একটি বড় টপিক নিয়ে থিসিস করাটা খুবই কঠিন। একটি ভাল থিসিসের গুণাবলি হল সেটি হবে পরিষ্কার এবং সুনির্দিষ্ট।

থিসিসের প্রথম অধ্যায়ের নাম সূচনা এবং এই অধ্যায়টি থিসিসের প্রাণ। একটি থিসিসের পুরো বিষয়বস্তু খুব অল্প কথায় এখানে লেখা হয় এবং পুরো থিসিসে কি আছে এই অধ্যায়টি তা খুব চমৎকারভাবে বর্ণনা করে। সুতরাং সূচনা লেখা সবচেয়ে কঠিন, তাই একজন গবেষকের উচিত কাজের শেষভাগে এসে সূচনা অধ্যায়টি লেখা।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে সাধারণত থাকে লিটারেচার রিভিউ। এই অধ্যায়টি খুব সতর্কভাবে লিখতে হয়, লেখা যেন অবশ্যই থিসিসের বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়, অপ্রাসঙ্গিক লেখা, কথা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। লিটারেচার রিভিউ সময় নিয়ে করতে হয় এবং রেফারেন্স পেপারের জার্নালের মান, যে গ্রুপ থেকে কাজটি করা হয়েছে তাঁরা কতটা বিশ্বস্ত এটি মাথায় রাখতে হয়। ভালো থিসিস করার প্রধান শর্ত হলো আপনি যে টপিক নিয়ে কাজ করবেন সে সংক্রান্ত প্রচুর আর্টিকেল, রিপোর্ট, জার্নাল ইত্যাদি পড়া। কমপক্ষে তিন মাস আপনার সংশ্লিষ্ট টপিক নিয়ে পড়াশোনা করা উচিৎ। এভাবে থিসিস সম্পর্কে আপনি অনেক কিছুই জানতে ও শিখতে পারবেন এবং সেইসাথে থিসিস পেপারে কোন কোন পয়েন্ট  যুক্ত করতে হবে ও বাদ দিতে হবে, কোন ফরম্যাটে লিখলে ভালো হবে, গবেষণার জন্য কোন কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন এসব সম্পর্কে ধারণা হবে। শুধু রিসার্চ পেপার পড়লেই হবে না, রিসার্চ পেপার সাথে যে সকল রেফারেন্স দেওয়া থাকে সেগুলোও খুঁজে বের করে পড়তে হবে। প্রথম দিকে হয়তো আপনি রিসার্চ পেপারের সব বিষয় বুঝতে পারবেন না, কিন্তু তিন মাসে অন্তত আপনি এটুকু বুঝতে পারবেন যে কোন বিষয়গুলো পরবর্তীতে আপনাকে থিসিস লিখতে সাহায্য করবে।

তৃতীয় অধ্যায়ে সাধারণত গবেষণা পদ্ধতি (রিসার্চ মেথোডলজি) লেখা হয়, যে কোন গবেষণার জন্য অনেক ধরণের পরীক্ষিত টেকনিক থাকে, কিন্তু এইখানে যে টেকনিক আপনি আপনার কাজে ঠিক যেভাবে ব্যবহার করেছেন ঠিক ওইভাবে তুলে ধরতে হবে। 

এবার আসি মূল পর্ব অর্থাৎ ফলাফল এবং আলোচনা (রেজাল্ট অ্যান্ড ডিসকাশন) অধ্যায়ে। স্নাতক লেভেলের থিসিসে ফলাফল এবং আলোচনা লিখতে একটি অধ্যায়ই যথেষ্ট। রেজাল্ট লিখতে গবেষণার অর্ডার ঠিক রাখতে হবে, একটি সাব-কন্টেন্ট এর সাথে অন্য সাব-কন্টেন্ট এর সংযোগ রাখতে হবে, অন্যথায় এটি খুব নিম্নমানের থিসিস হবে। এই বিষয়গুলো খুব অল্প কথায় উল্লেখ করে রেফারেন্স পেপারের সাপোর্ট নিতে হবে, অন্যথায় পাঠক মিস-গাইডেড হতে পারেন। আগে যেভাবে বলেছি, সকল রেফারেন্স পেপার মান সম্পন্ন কি না তা সব সময় মাথায় রাখতে হবে, নিম্নমানের পেপার কখনোই সাইট করা উচিৎ না। 

থিসিসের কনক্লুসন আর এবসট্র্যাক্ট থিসিস শেষ হলেই লেখা উচিৎ, বিশেষ করে, থিসিস সাবমিশন এর ঠিক ২/১ দিন আগে সব কারেকশন শেষ হলে তখনই এবসট্র্যাক্ট লিখা উচিৎ। আর কনক্লুসন লিখতে গিয়ে অনেকেই সামারি লিখে ফেলে। আপনার থিসিস এর বিশেষ বার্তা খুব সতর্কভাবে কনক্লুসন এ লিখা উচিৎ, যাতে একজন রিডার থিসিসটি পড়ে মনে করে, এটাই তো জানতে চেয়েছিলাম, আমার সময়টা বৃথা যায়নি, থিসিসের রেজাল্ট যেন এই বার্তাকেই সাপোর্ট করে।

থিসিস পেপারের প্রথম অংশ হচ্ছে অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং সর্বশেষ অংশ কনক্লুশনের পর রেফারেন্স সেকশন উল্লেখ করা হয়। অনেক শিক্ষার্থী এ দু’টো অংশকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু থিসিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু’টো অংশ হচ্ছে অ্যাবস্ট্রাক্ট ও রেফারেন্স। পুরো থিসিসের মূল সারমর্ম তুলে ধরা হয় অ্যাবস্ট্রাক্টে। একজন পাঠক সবার আগে থিসিসের এই অংশে চোখ বোলাবে। তাই এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে করে পাঠকের মনে আপনার থিসিস নিয়ে কৌতূহল জাগে। যে সকল সূত্র থেকে আপনি গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করেছেন, যেমন- বই, অন্যান্য রিসার্চ পেপার, রিপোর্ট, ওয়েবসাইট ইত্যাদি ক্রমানুসারে বিস্তারিত রেফারেন্সে  উল্লেখ করতে হবে। যাতে পাঠকরা চাইলেই তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো তথ্য সেসব সূত্র থেকে খুঁজে বের করতে পারেন। রেফারেন্সের সঠিক উপস্থাপন আপনার থিসিস পেপারকে আরো আস্থাভাজন ও মানসম্মত করে তুলবে। তাই আপনি যদি চান পাঠক আপনার গবেষণাটি সম্পর্কে জানুক, তাহলে এ দুটি অংশের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিন।

থিসিস তৈরি করা বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। আপনি যদি মনে করেন হঠাৎ কোনো প্রস্তুতি ছাড়া কাজ শুরু করে ২-৩ মাসের মধ্যে মানসম্পন্ন থিসিস তৈরি করতে পারবেন, তাহলে ভুল ভাবছেন। কারণ প্রচুর পরিশ্রম, অনেক পড়াশোনা, মনোযোগ সহকারে গবেষণা করে থিসিস পেপার তৈরি করতে হয়। আপনার ছোট একটি ভুলের কারণে আপনার থিসিসের মান খারাপ হতে পারে, এমনকি আপনার থিসিস পেপার প্রত্যাখ্যাতও হতে পারে। তাই পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে থিসিসের কাজ শুরু করুন। থিসিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মিত সুপারভাইজারের সাথে যোগাযোগ রাখা। আপনার কাজের মান কী রকম হচ্ছে, সব ঠিক আছে কিনা, কোন ভুলত্রুটি রয়েছে কিনা এসব বিষয় নিয়ে আপনার সুপারভাইজারের সাথে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে। এটা যেমন মার্ক পেতে সহায়তা করবে, সেই সাথে ভবিষ্যতে ভালো সুপারিশের জন্যেও কাজে লাগবে। এছাড়াও থিসিস পেপারে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক কম থাকবে। 


লেখক: মো. মাসুদ-ঊন-নবী শুভ- শিক্ষার্থী, এমএসএস (প্রথম বর্ষ), গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/বিএএফ