দেশে করোনার ভয়ে হল ফাঁকা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ০২:০৯

মঙ্গলবার, দুপুর ১২টা। মতিঝিলের মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে গিয়ে মনে হলো প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধ! পরে নিরাপত্তারক্ষীর কথায় নিশ্চিত হওয়া গেল, হল খোলা। কিন্তু দর্শক খরায় যে কারও এমনটা মনে হতেই পারে। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর ৪ জন দর্শককে দেখা গেল কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যেতে। তাদের পিছু পিছু গেলাম, কথা হলো মধুমিতা সিনেমা হলের ক্যাশিয়ার মো. আশরাফুল আলমের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই হলে মানুষ আসে না। শাকিব খান-নুসরাত ফারিয়ার শাহেনশাহ চলছে। আশা ছিল ভালো দর্শক পাবো। কিন্তু করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে দর্শক একেবারেই নেই বললে চলে।’ হল চালাতে দৈনন্দিন যে খরচ সেটা উঠাতেও হিমশিত খেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

দু-বছর ধরে দর্শকরাও সিনেমা হলের চৌকাঠ না মাড়ানোর ফলে খাঁ খাঁ করছে সিনেমা হলগুলো। তারপরও মাঝেমধ্যে কিছু মানুষ অবসর কাটানোর জন্য হলেও ভেতরে যেত করোনা আতঙ্কে তারাও এড়িয়ে চলছেন! দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ শনাক্ত হওয়ার থেকেই আতঙ্ক বেড়েছে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সিনেমা হল সর্বত্রই সতর্ক অবস্থানে সাধারণ মানুষ। প্রেক্ষাগৃহেও এর প্রভাব চোখে পড়ার মতো।

রাজধানীর ফার্মগেটে অবস্থিত আনন্দ সিনেমা হলেও চলছে শাহেনশাহ। সন্ধ্যা ৬টায় শো শুরু, কাউন্টার খুলেছে ৫টায়। নিরাপত্তারক্ষী সচেতন, করোনা আতঙ্কে তিনি মাস্ক পরেছেন। জানালেন, যদি সম্ভব হতো তিনি ঘর থেকেই বের হতেন না। কিন্তু চাকরি তো বাঁচানো লাগবে! তাই মাস্ক পরেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সতর্ক অবস্থানে আছেন। কাউন্টারের কর্মীদেরও একই অবস্থা। তারা জানালেন, সবাই জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন। তাই প্রেক্ষাগৃহেও দর্শকের সংখ্যা কম।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেক্ষাগৃহগুলোর কর্মীরা সতর্ক হলেও করোনার প্রস্তুতি বলতে কিছু নেই। রাজধানীর মধুমিতা, বলাকা, আনন্দ, চিত্রামহল ও সেনা সিনেমা হলে গিয়ে দেখা গেছে দর্শক ও কর্মীদের জন্য কোনো ধরনের হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা নেই। অনেক সিনেমা হলে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে হাত ধোয়ারও ব্যবস্থা নেই।

করোনা আতঙ্কে প্রভাব পড়েছে সিনেমা মুক্তিতেও। এমনটিই জানিয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম।

শামসুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ৩ জনকে শনাক্ত করার পর থেকেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সোমবার থেকে সিনেমা হলে দর্শকও কমেছে। যে কারণে সিনেমা হলে নতুন ছবি মুক্তির বিষয়টি প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এরইমধ্যে ছবি মুক্তির জন্য যারা নিবন্ধন করেছিল তারা মুক্তি থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আমাদের কাছে আবেদন করছেন মুক্তি পেছানোর জন্য।’

এরইমধ্যে ১৩ মার্চ মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবি ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ মুক্তি না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল। আগামী ২০ মার্চ মুক্তির ঘোষণা ছিল ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২’ ছবির। দেবাশীষ বিশ্বাস পরিচালিত এ ছবিতে প্রথমবারের মতো জুটি বেঁধেছেন নায়ক বাপ্পী ও অপু বিশ্বাস। তবে করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করলে ছবির মুক্তি পেছাবে বলে জানিয়েছেন পরিচালক। সুজন বড়ুয়ার ‘বান্ধব’ ছবিটিও ২০ মার্চ মুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এ ছবিটিও নির্দিষ্ট তারিকে মুক্তি না দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন ছবিটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অনুপম কথাচিত্রের কর্ণধার অনুপ কুমার বড়ুয়া।

বাংলাদেশ প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া আলাউদ্দিন দাবি করেছেন, ‘শাকিব খানের সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু দর্শক নেই। করোনা ভাইরাসের ভয় দর্শক কমিয়েছে। সবারই তো জীবনের মায়া আছে, যে কারণে দর্শক কম আসছে হলে। সরকারও বলছে, যেখানে জনসমাগম, সেখানে কম যাতায়াত করতে। যেহেতু সিনেমা হলে জনসমাগম হয়, তাই দর্শক এখন কম আসছে। আরেকটা বিষয়কেও ছাড় দেওয়া যায়, নায়ক-নায়িকা কাউকেই ছবির প্রচারণায় দেখা যায়নি।’

এ বিষয়ে শামসুল আলম আরও বলেন, ‘দেশে করোনা ভাইরাস যদি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে তখন সবাইকে নিয়ে আমরা বসবো। তখন বিষয়টি নিয়ে আমরা অফিশিয়ালি সিদ্ধান্ত নেবো। সিনেমা হল মালিকরাও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। এখনও বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।’

ইত্তেফাক/বিএএফ