করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি প্রেক্ষাগৃহে তালা ঝুলছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের বিনোদনের চাহিদা একটুও কমেনি। বরং বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ লকডাউনের কারণে গৃহবন্দি হওয়ায় চিত্ত-বিনোদনের দ্বারস্থ হচ্ছেন আরও বেশি। যেমন আগে অফিস কিংবা পড়ালেখার চাপে সিনেমা দেখা হতো না অনেকেরই। তাই এই দিনগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিচ্ছেন তারা। আর তাই বেশিরভাগ মানুষই ভর করছেন ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ের ওপর।
নেটফ্লিক্সের প্রধান টেড সারানডস বলেন, ‘করোনার কারণে আমাদের গ্রাহক বেড়েছে সত্যি, কিন্তু আমরা বেশিরভাগ দেশেই হাই ডেফিনেশন (এইচডি) বা আল্ট্রা হাই-ডেফিনেশন (ইউএইচডি) স্ট্রিমিং সেবা বন্ধ করে দিয়েছি। শুধুমাত্র স্ট্যান্ডার্ড ডেফিনেশন স্ট্রিমিং (সর্বোচ্চ ৪৮০পি) চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে ভারতসহ অনেক দেশে। এর নেপথ্য কারণ যাতে দেশের আরও বেশি করে মানুষ ঘরে বসে থেকে নির্বিঘ্নে ইন্টারনেটের দ্রুতগতির ব্যান্ডউইডথ পরিষেবা পায়।’ করোনার সময়ে নেটফ্লিক্স এরইমধ্যে ‘দ্য উইচার’ বা ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’সহ সব সিরিজের শুটিং বন্ধ করে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও নেটফ্লিক্সে সাবস্ক্রিপশন বেড়েছে কয়েকগুণ। চলচ্চিত্র ও সিরিজ দেখার প্রবণতাও বেড়েছে বলে কর্তৃপক্ষের দাবি। এদিকে করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মিল রয়েছে এ রকমই এক গল্পের প্লট নিয়ে তৈরি কোরিয়ান সিরিজ ‘মাই সিক্রেট টেরিয়াস’ এখন নেটফ্লিক্সের টপ সার্চের শীর্ষে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল স্ট্রিমিং বাণিজ্যের ধারণাকে বিরাট এক সাফল্য এনে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। হলিউডে ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে। অবশ্য করোনার সঙ্কট শুরু হওয়ার আগে থেকেই দর্শকদের হলবিমুখতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল বড় স্টুডিও ও হল মালিকদের মধ্যে। নেটফ্লিক্স, এমএক্স প্লেয়ার, হটস্টার, অ্যামাজন প্রাইমসহ একাধিক প্লাটফর্ম ছাড়াও ডিজনি, ইউনিভার্সাল ও সনির মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। যেমন গত ২০ মার্চ ইনভিজিবল ম্যান সিনেমাটি অনলাইনে ভাড়া দেওয়া শুরু করে ইউনিভার্সাল। যে কাউকে সিনেমাটি দেখতে হলে খরচ করতে হচ্ছে ২০ ডলারের কাছাকাছি। এত চওড়া দাম দেওয়ার পরও মানুষ সিনেমাটি দেখছে বলে জানিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। অ্যামাজন স্টুডিওর সাবেক হেড অব স্ট্র্যাটেজি ম্যাথু বল বলেছেন, ‘কভিড-১৯ ডিজিটাল বিপণন ও ব্যবসায়িক মডেলকে জনপ্রিয় করে তুলবে। সিনেমা হল, পার্কগুলো ব্যবসা হারাবে, ফুলে ফেঁপে উঠবে ডিজিটাল কোম্পানিগুলো।’ প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, দিল্লিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তি রোহিত দত্ত জানিয়েছেন, দিল্লির সফরদারজং হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকাকালে তিনি তার ফোনে নেটফ্লিক্স দেখেছেন।
আরও পড়ুন: করোনা শনাক্ত ও চিকিৎসাসেবা দিতে আগ্রহী বেসরকারি হাসপাতাল
প্যরামাউন্ট এপ্রিলে তাদের রোমান্টিক কমেডি ‘দ্য লাভবার্ডস’ মুক্তি দেবে নেটফ্লিক্সে। কথা হচ্ছে, এসব পরিবর্তন আপাতত করোনা ভাইরাসের মহামারিকে মোকাবেলা করতে গিয়ে হচ্ছে। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, এ সঙ্কট কেটে গেলে অনেকদিন এসব প্রক্রিয়া ঘুরে ফিরে অব্যাহত থাকবে। নতুন নতুন ছবি যদি মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে হলে না গিয়ে ঘরে বসেই দেখা যায় তাহলে কতজন দর্শক আর হলে যেতে চাইবেন? তাছাড়া মোটামুটি সব প্লাটফর্মেরই শুটিং বন্ধ। হয়তো আরও দু-মাস চালানোর মতো প্রডাক্ট তাদের কাছে আছে। কিন্তু এরপর ডিজিটাল স্ট্রিমিংয়ে কী দেখানো হবে? সেটা নিয়ে ভাবছেন সংশ্লিষ্টরা। দুনিয়াজুড়ে সিনেমা হলগুলো বন্ধ পড়ে আছে। বন্ধ হয়ে গেছে চলচ্চিত্র, নাটক, থিয়েটারসহ বিনোদন জগতের সব ধরনের কার্যক্রম। বড় হাউজগুলো নতুন ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। ডিজিটাল প্লাটফর্ম আরও বিকশিত হচ্ছে। সবাই বলছেন, ‘সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।’
ইত্তেফাক/এসি
