আইনি ভিত্তি না থাকায় নীতিমালা শুধু কাগজে কলমে, প্রয়োজন আইন

বেড়েই চলছে গৃহ শ্রমিক নির্যাতন, আশংকাজনক ভাবে যৌন নির্যাতন বৃদ্ধি

আপডেট : ০১ মে ২০২০, ১৫:০৬

গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে ইফতার তৈরিকে কেন্দ্র করে ১৪ বছর বয়সের গৃহ শ্রমিক লিলিকে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেয়া হয়। বছরের শুরুতেই গৃহ শ্রমিককে হাত মুখ বেধে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁক দেয়ার ঘটনা প্রকাশ পায় গণমাধ্যমে। গৃহ শ্রমিক নির্যাতন বন্ধে ২০১৫ সালে করা 'গৃহ শ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি' আছে কাগজে কলমে। তা পরিবর্তন করতে পারছে না গৃহ শ্রমিকের ভাগ্য। আইন করার কথা থাকলে পাঁচ বছরেও করা হয়ে উঠেনি গৃহ শ্রমিকের রক্ষাকবচ আইন। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা বলছেন নীতি আইন নয় বলে এটি মানার বাধ্যবাধকতা নেই। নীতি না মানলে শাস্তির বিধানও নেই। তাই অনতিবিলম্বে আইন করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন তারা।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যমতে ২০১৫-১৯ সালে মোট ১৯৩ জন গৃহ শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়। এ সময় ২৩ জন গৃহ শ্রমিক হত্যা, ৩২ ধর্ষণ, ৮৪ জন গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, ৫৪ জন আত্মহত্যা ও রহস্যজনক হত্যার চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে ১৪৯ জন গৃহ শ্রমিক নিহত হয়েছে এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরও ১৪৮ জন। হতাহত গৃহ শ্রমিকের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। গবেষণা অনুসারে, কেবল ২০১৮ সালেই নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ১৮ গৃহ শ্রমিক এবং গুরুতর আহত হয়েছে আরও ১৮ জন, এ ছাড়া নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছে আরও ৪ জন। ২০১৭ সালে নির্যাতনে শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ২৭ জন এবং আহত হয়েছে আরও ২৩ জন। ২০১৬ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে ৩৮ জন এবং আহত হয়েছে ২৩ জন। কিন্তু এই তথ্য শুধুই নির্যাতনে নিহত ও গুরুতর আহতদের। কিন্তু হরহামেশাই গৃহ শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে যা কখনো প্রকাশ পাচ্ছে না। তাই প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি।

কি আছে নীতিমালায়?

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই নীতিমালা প্রণয়ন করে। যাতে আছে গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে এক মাস আগে তা জানাতে হবে। গৃহকর্মীও যদি চাকরি ছাড়তে চান, তবে নিয়োগকারীকে তা এক মাস আগে জানাতে হবে। তাৎক্ষণিক ভাবে গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিলে এক মাসের মজুরি দেওয়ার বিধান করা রয়েছে। পূর্ণকালীন গৃহকর্মী নিয়োগ দিয়ে তাঁর ছবিসহ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, গৃহকর্মী অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে, তবে নিয়োগকারী নিজে তাকে শারীরিক বা মানসিক শাস্তি দিতে পারবেন না। গৃহকর্মীর বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর হতে হবে। তবে তাকে হালকা কাজ করাতে হবে। এ ছাড়া ১২ বছর বয়সের কাউকে গৃহকর্মী হিসেবে রাখতে হলে তার আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষের উপস্থিতিতে নিয়োগকারীকে আলোচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ওই শিশুর স্বাস্থ্য যাতে বিপজ্জনক না হয় এবং তার শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের গৃহকর্মীরা বেতন সহ ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবে, যা গৃহকর্তাকে দিতে হবে। গৃহ শ্রমিকদের সহায়তার জন্য হেল্প লাইন চালু করতে হবে সরকারকে। এ ছাড়া কোনো গৃহকর্মী যৌন হয়রানি ও নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করলে সরকার সেই মামলা পরিচালনা করবে। আবার নীতিমালাটি বাস্তবায়নে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি তদারকি সেল থাকবে। কোনো গৃহকর্মী বঞ্চনা বা নির্যাতনের শিকার হলে মনিটরিং সেল, মানবাধিকার ও গৃহ শ্রমিক সংগঠনের কাছে টেলিফোনে, মৌখিক বা লিখিতভাবে অভিযোগ করতে পারবে। বিশ্রাম ও ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে নীতিমালায়।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুছ সহিদ মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, নীতি মালায় অনেক ভাল ভাল বিষয় উঠে এসেছে। কিন্তু এগুলো মানা হচ্ছে না। নীতিমালার আইনি ভিত্তি না থাকায় কেউ তা না মানলে তাকে আইনের আওতায় আনা যায় না। আবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে তদারকি শেল থাকার কথা ছিল তাও কার্যকর নয়। তাই আমরা একটি আইনি কাঠামোর দাবি করে আসছি। আমাদের চলতি বছর তিনমাসের গৃহ শ্রমিক মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী গৃহ শ্রমিক ধর্ষণের ঘটনা এ বছর আশংকাজনক ভাবে বেশি।

দেশের গৃহ শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যার কোন তথ্য নেই। ২০১০ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশে গৃহ শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ। বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ লাখও হতে পারে। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে গৃহ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। এরমধ্যে শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা ৪ লাখ ২০ হাজার, যাদের ৭৫ ভাগই কন্যা শিশু বলে মনে করে সংস্থাটি।

আইনের সুরক্ষায় এনে গৃহ শ্রমিকদের নির্যাতন প্রতিরোধ ও তাদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার সময় এসেছে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমের মর্যাদা দেওয়ার উন্নত মানসিকতা সবার মধ্যে থাকতে হবে। কারণ তারা শ্রমের বিনিময়ে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে। তারা পরজীবী নয়।

তিনি বলেন, গৃহ শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালন এর জন্য নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের অধিকার রক্ষায় গৃহ শ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা-২০১৫ এর বাস্তবায়ন করতে হবে। গৃহ শ্রমিকদের সম্মান দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একজন গৃহ শ্রমিককে তার ন্যায্য মজুরি ও সম্মান দিতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষ যে কোনও অবস্থানে থাকুক না কেন, তাদের মর্যাদা দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষকে মর্যাদা দিতে হবে, হোন না সে গৃহ শ্রমিক। যদিও এখনও আমাদের মাঝে সেই চেতনার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

এ বিষয় আলাদা আইনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্ট্ররাল প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, মহিলা ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় এখন অপরাধীর বিচার হচ্ছে। এই আইন যথাযথভাবে কার্যকর করতে পারলেই অপরাধ কমে আসবে।

ইত্তেফাক/আরএ