নাসিমা বেগম। থাকেন রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্টের পেছনে। তিনি বিকালে পিঠা বানাতেন। চালের গুঁড়া দিয়ে চিতই ও ভাপা পিঠা বানিয়ে বিক্রি করতেন। যা আয় হতো তা দিয়ে সংসারের খরচ হয়ে যেত। প্রতিদিন তার সাত থেকে আট’শ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। দুই সন্তান পড়াতেন স্কুলে। দিতেন ঘর ভাড়াও।
ভালোই চলছিল তার সংসার। কিন্তু বিধি বাম। এরই মধ্যে মহামারি করোনা ভাইরাস হানা দিল। গত ২৬ মার্চ যখন পিঠা বিক্রির জন্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে গেলেন, তখন নিরাপত্তাকর্মীরা উঠিয়ে দিলেন। বললেন করোনার কারণে লকডাউন। পিঠা বিক্রি করা যাবে না। সব বন্ধ। তখন তিনি মনে করেছিলেন কালপরশু হয়ত আবার পিঠা বিক্রি করতে পারবেন। এরপর কেটে গেল দুই মাসেরও বেশি। সকালে যে বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন তারাও নিষেধ করে দিলেন। বললেন লাগবে না। দরকার হলে পরে জানাব।
নাসিমা শতভাগ বেকার হয়ে ঘরে বসে গেলেন। ঘর ভাড়াও বাকি। বাড়িওয়ালা বলেছেন, বাড়ি চলে যান। কবে করোনা যাবে; ঠিক নাই। বাড়ি তো নাই কোথায় যামু কন? ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে পড়ে আছি।’
তার মতোই অন্য এক নারী পথ খবার বিক্রেতা জানালেন, ‘লকডাউনে কেউ খোঁজও নেয়নি। ত্রাণের জন্য গেছিলাম। বলছে তুই ত্রাণ পাবি না। তুই এখানের ভোটার না। এখন লকডাইন উঠে গেছে। কিন্তু আর আগের মতো বিক্রি হয় না। সংসারও চলে না।’
রাজধানীতে এ রকম হাজারো পিঠা বিক্রেতা, রাস্তার পাশে বা রাস্তায় ডিম বিক্রেতা, ছোলা মুড়ি পেঁয়াজু বা ভাত বিক্রেতা এখন বেকার। কাজ হারিয়ে এখন তারা দিশেহারা। লকডাউন উঠে গেলেও এখন আর বিক্রি হয় না। যা বিক্রি হয় তা দিয়ে সংসারও চলে না। এদের অনেকেই এখন তাদের পরিবার ও সন্তানদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
এফডিসির সামনে ভ্যানে ছোলা বুট ও মুড়ি বিক্রি করেন শহিদুল ইসলাম। থাকেন দিলু রোডে। উজিরপুরের এই বৃদ্ধ জানালেন আগে জমজমাট ছিল এফডিসি পাড়া। এখন তেমন কেউ আসেও না; খোলা খাবার খেতেও চায় না। দিনে এক দুইশ টাকাও টিকে না।
একইভাবে কাওরান বাজারের কাঠপট্টির বেগুনি পেঁয়াজু বিক্রেতা ময়মনসিংহের আনোয়ারও জানালেন, ‘আয় নেই। কী ঘর ভাড়া দেব আর কী খাব?’ মেরুলের হাতিরঝিলের শেষ মাথায় সব সময় বিকালে বাদম বিক্রি করেন ভৈরবের এক বৃদ্ধ। তিনি জানালেন দুই মাসের ঘরভাড়া বাকি পড়েছে।’
মহামারি করোনা শুরুর আগে রাজধানীর কোর্টপাড়ায় বা ব্যাংকপাড়া মতিঝিলে অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়ায়, নিউমার্কেট ও নীলক্ষেত এলাকায়, পুরান ঢাকার, মিরপুরের অলিতে-গলিতে দেখা যেত পথ খাবার (স্ট্রিট ফুড) বিক্রেতাদের। দেখা যেত ক্রেতাদেরর ভিড়। কিন্তু এখন এইসব খাবার বিক্রেতাদের দেখা যায় না। যে দুই একজনকে দেখা যায় তারাও আবার বলেছেন কিছু রিকশাওয়ালা ও দিনমজুর ছাড়া অন্য ক্রেতা তেমন একটা নেই। কোনোভাবে চলতে হচ্ছে।
আরো পড়ুন: প্রতিদিন ‘পথ খাবার’ খাচ্ছেন ৬০ লাখ মানুষ
নিউমার্কেট এলাকায় একটি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি সুশান্ত কর্মকার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সারা দিন বাইরে থাকতে হয়। আগে দুপুরে ফুটপাতের খাবারই খেতাম। এখন খাই না। কখন কি হয় বলা তো যায় না।’
২০১৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক কার্যক্রমের আওতায় শুধু ঢাকার দক্ষিণ সিটিতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার পথ খাবার বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রকল্প গ্রহণ করে। সেই হিসাবে রাজধানীতে ২০১৫ সালেই পথ খাবার বিক্রেতা ছিল ২০ হাজারেরও বেশি। এর সঙ্গে যদি অন্যান্য যেমন ছোলা বুট, পেঁয়াজু এই ধরনের বিক্রেতাদের ধরা হয় তবে তা অর্ধ লক্ষাধিক হবে বলে মনে করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী কানিজ ফাতিমা।
কানিজ ফাতিমা ইত্তেফাককে বলেন, ‘করোনার এই মহামারির সময় এদের অধিকাংশকে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে না। এরা অর্থ কষ্টে আছেন। খেয়ে না খেয়ে আছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক এই সব মানুষকে সহযোগিতার জন্য সরকারের আরো বেশি সক্রিয় হওয়া উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘জীবন ও জীবিকা আলাদা কোনো বিষয় নয়। প্রথমত, আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা এই সময় কর্মহীন হয়ে অভুক্ত থাকার আশঙ্কায় পড়েছেন তাদের মৌলিক চাহিদা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।’
অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ আরো বলেন, ‘এই ক্ষমতা আমাদের আছেও। দরকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। আর তা না হলে সাবনে আরো কঠিন সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’
ইত্তেফাক/এএএম
