করোনাকে তাচ্ছিল্য রাজনৈতিক বুমেরাং হলো ট্রাম্পের

আপডেট : ২৪ জুন ২০২০, ০৮:১৭

বিশ্ব জুড়ে মহামারি সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা উপেক্ষা করার মাশুল রাজনৈতিকভাবে দিতে হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ হাজার করে লোক এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত এবং কয়েক শ করে মানুষের মৃত্যু হলেও ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে অবিশ্বাস্যভাবে তাচ্ছিল্য করে চলেছেন প্রতি মুহূর্তে। ফলে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে যে লাখ লাখ মানুষ তাদের স্বজন হারিয়েছেন এবং হারিয়ে চলেছেন তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

যে মুহূর্তে ঘরে থাকা এবং সামাজিক দূরত্ব পালন ভীষণ জরুরি সেই মুহূর্তে প্রবল সমালোচনা উপেক্ষা করে তিনি নির্বাচনী প্রচারণা সভার আয়োজন করলেন। গত শনিবার ওকলাহোমা রাজ্যে সেই বহুল আলোচিত নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে হাতেগোনা মানুষের উপস্থিতি ট্রাম্পকে উজ্জীবিত করার পরিবর্তে তার কপালে চিন্তার ছাপ ফেলে দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেবেছিলেন তার সমর্থকরা তার মতোই করোনাকে ভয় করে না। তাই টানা তিন/চার মাস পর জনসভা করায় তাকে দেখতে কর্মী-সমর্থকরা বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো হাজির হবে সমাবেশ স্থলে। সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে ট্রাম্পও টুইটারে একটু বাড়াবাড়ি করে ঘোষণা দেন, তার জনসভায় অংশ নিতে ১০ লাখ লোক টিকিট চেয়ে আবেদন করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বমিডিয়ার নজর চলে যায় এই জনসভার দিকে। সবার মনে প্রশ্ন জাগে—‘আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ তাদের প্রেসিডেন্টের মতোই করোনার ভয় জয় করে ফেলেছে? সত্যিই কি তারা লাখে লাখে ট্রাম্পের জনসভায় হাজির হবে সংক্রমণের ভয় তুচ্ছ করে?’

যে সেন্টারে জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে ১৯ হাজার আসন ছিল। ট্রাম্প শিবিরের পরিকল্পনা ছিল ভেতরে ১৯ হাজার লোক বসার পর বাকি ‘লাখ লাখ’ মানুষের জন্য বাইরে বড়ো পর্দায় প্রেসিডেন্টের ভাষণ শোনার ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, বাইরে বড়ো পর্দার প্রয়োজন তো দূরের কথা, ভেতরের ১৯ হাজার আসনের অর্ধেকই পূরণ হয়নি! বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী সাকুল্যে ৮/৯ হাজার লোক হতে পারে। ট্রাম্পকেও তাই তেমন উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায়নি বক্তব্য রাখার সময়।

মার্কিন মিডিয়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের এই জনসভা নিয়ে রীতিমতো ব্যঙ্গবিদ্রূপ হচ্ছে। করোনা ভাইরাসকে ভয় না করে ‘লাখ লাখ মানুষ’ সমাবেশে আসার যে সম্ভাবনার কথা ট্রাম্প প্রচার করেছিলেন, তার জন্য এখন তাকে রাজনৈতিকভাবে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তার এই বাগাড়ম্বর রীতিমতো বুমেরাংয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি লোকের মৃত্যু হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প সেই জনসভায় বলেছিলেন, ‘যত পরীক্ষা তত শনাক্ত হবে। তাই আমি মানুষের পরীক্ষা না করাতে বলেছি। কিন্তু ওরা (দেশের স্বাস্থ্যবিভাগ) পরীক্ষা করেই যাচ্ছে।’ পরে অবশ্য হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি বলেন, প্রেসিডেন্ট কৌতুক করে কথাটি বলেছিলেন। কিন্তু তাতেও চিড়ে ভিজছে না। কটাক্ষবাণে জর্জরিত হচ্ছেন তিনি।

ট্রাম্পের মতে করোনা নাকি এমন কোনো মারাত্মক ভাইরাস নয়! তাই ‘কিছু ঘটছে না’ মনে করে বালুর মধ্যে মাথা গুঁজে থাকার পক্ষপাতী তিনি। অথচ পরে জানা গেল, ঐ সভা থেকে ফেরার পর তার অফিসের আট জন স্টাফ এবং গোয়েন্দা বিভাগের দুই জন কর্মকর্তার করোনা শনাক্ত হয়েছে। এতে আরো চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। ‘লাখ লাখ’ সমর্থকদের এনে দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার সমর্থকরা তার মতোই করোনাকে ভয় পায় না। এ কারণে তিনি এই নির্বাচনী সভার নামকরণ করেছিলেন ‘গ্রেট আমেরিকান কামব্যাক’। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে— আমেরিকা তো দূরের কথা, ট্রাম্পের আহ্বানে করোনার ভয় উপেক্ষা করে তার ভোটের প্রচার শুনতে কয়েক হাজার লোকও না আসায় বিব্রত ট্রাম্প শিবির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন থেকে ছোটো অডিটরিয়ামে জনসভা করা হবে যাতে অল্প লোকেই ‘হাউজফুল’ দেখায়। আর যেন বিব্রত না হতে হয়।

তাছাড়া তার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে এদিন কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন ট্রাম্প। তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ‘আনফিট’ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে আহ্বান জানান দেশবাসীর প্রতি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যে ভাষায় তিনি বাইডেনকে আক্রমণ করেছিলেন তা তার কট্টর সমর্থকদেরও বিস্মিত করবে। ট্রাম্প রাজনৈতিক শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করেছিলেন বলে সমালোচকদের অভিযোগ।

ট্রাম্প ওকলাহোমায় বড়ো ধাক্কা খাওয়ার পর এবার এরিজোনাসহ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে যাবার পরিকল্পনা করেছেন। তার ‘কামব্যাক’ করার ডাকে সেসব রাজ্যের বাসিন্দারা সাড়া দেবে কি না সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে ফক্স নিউজ বলেছে, ট্রাম্পের পুরোপুরি হতাশ হবার কারণ নেই। মানুষ তার ডাকে সেদিন করোনার ভয় উপেক্ষা না করলেও টিভিতে নাকি তার জনসভার বক্তব্য শুনেছে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ। সুতরাং মাঠে না গেলেও ঘরে বসে নেতার বক্তব্য শুনতে আগ্রহের কমতি ছিল না। সূত্র: সিএনএন