আবুল কাসেম
শুকতারা ও আকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। দর্শন ওদের বিষয়। যমজ ভাইবোন। দূরের কোনো গাঁও থেকে আসা। ওদের বাপটা স্কুলশিক্ষক। ওদের চেহারায় পোশাক-আশাকে-চালচলনে কোনো আত্মম্ভরিতা নেই। জন্মটা শুকতারার আগে। আকাশের জন্ম কয় মিনিটের ব্যবধানে। এই-যা ছোটোবড়ো। চেহারায় অদ্ভুত মিল। শরীরটা চিকন-চাকন। দুজনই বেশ লম্বা। গল্পগুজব-বেড়ানো একইসঙ্গে। শুধু রাতটা কাটে হলে। ঐটাই ওদের পৃথকের সময়। যারা জানে না, তারা দুজনকে প্রেমিক-প্রেমিকা ভাবে। বলে, বেশ তো মানিয়েছে ওরা।
চেহারা আর মনের এত সুন্দর মিল—যা ওরা নিজেরা কোথাও খুঁজে পায় না। প্রকৃতির কী এমন নিদর্শন এখানে, যা ওদের ভাবিত করে। দর্শন নিয়ে পড়ার কারণে ওরা সমাজ ও জীবন নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করে। ওরা ভাবে, প্রায় মানুষের চেহারাতে সুন্দর মনের প্রতিচ্ছবি নেই। কেমন এলোমেলো ভাব। শক্তিদম্ভের ছাপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের ক’বছর চলে যায়। ওদের আরো একটা সুন্দর পরিচয় আছে। ওরা এখানকার সব অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ করে থাকে। যমজ ভাইবোন হিসেবে ওরা সমাদৃত। ‘চেহারা’ এই শব্দটি নিয়ে শুকতারা প্রায়ই কথা বলে। তা মানুষের, সমাজের, দেশের, পৃথিবীর চেহারা নিয়ে। সে বলে, ‘মনের সঙ্গে চেহারার নিবিড় সম্পর্ক। পাপ-সংক্রমিত মন ভালো চেহারা উপহার দেয় না। অনাবিল সুন্দর মনের চেহারা সুন্দর। কলুষমুক্ত মানুষ মানে পৃথিবী ভালো, তার চেহারাও ভালো।’
শুকতারার কথা নিয়ে অনেকে ভাবে। কেউ কেউ আলোচনাও করে। অবাক হয় অনেকে। তার কথা তো সত্য। আমরা প্রায়শ প্রত্যক্ষ করি, ভয়ংকর যুদ্ধংদেহি চেহারা; সমাজের বেহালদশার বিশ্রী রূপ বা চেহারা; দেশের লুটপাটের চেহারা; দুনিয়ার অমঙ্গলের কদর্যরূপ বা চেহারা। অফিসের বসের ব্যাপারে অনেক সময় বলা হয়, ‘বসের চেহারা-মেজাজে আগুন, এখন কথা বলা যাবে না।’
ক্যাম্পাসের আইকন যেন ওরা দুই ভাইবোন। সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দৃষ্টি ঐ যমজ ভাইবোনের দিকে। ছোট্ট একটি শব্দ ‘চেহারা’, তার কত শুভাশুভ-আবিল-অনাবিল রূপ। তা নিয়ে এমন করে কিছু ভাবা যায়, হয়তো জানা ছিল না। শিক্ষণীয় বিষয় বটে। প্রকৃতির অমোঘ সত্য, মাটির কাছ থেকে সে জানান দেয়, তার সেই শব্দটা মঙ্গল বয়ে আনে।
শুকতারা ও আকাশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ। ওদের বিদায়ের পালা। অনুষ্ঠান হয়। সংশ্লিষ্ট সবাই উপস্থিত থাকে। অনেকে বক্তব্য রাখে। সেদিন শুকতারা আবেগাপ্লুত হয়ে কথা বলে। ও বলে, ‘অনাবিল মনের অনাবিল চেহারা। চেহারাই মনের আয়না। এই মনই আমাদের কাঙ্ক্ষিত সাধনার উপাদান হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাহলেই সমাজের, দেশের, পৃথিবীর এবং আমাদের চেহারা অনাবিল থাকে। আর এই চেহারাতেই প্রস্ফুটিত হয় পুষ্পের অনাবিল হাসি। জীবনব্যাপী এর আরদ্ধ চর্চা যেন আমাদের সাধনার অংশ হয়।’ বক্তৃতার মঞ্চ থেকে নেমে শুকতারা কুশল বিনিময় পর্বটা শেষ করে। অতঃপর যমজ ভাইবোন দুটি দিনের কোনো এক সময় ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়।
