বজ্রপাত বাড়িয়া চলিয়াছে সারাদেশে। ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী গত শনিবার সকালে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় বাড়ির কাছাকাছি জমিতে হাঁসকে খাবার খাওয়াইতে লইয়া যাইবার সময় বজ্রপাতে এক মাদ্রাসাছাত্রের করুণ মৃত্যু হইয়াছে। বর্তমানে করোনার আতঙ্ক তো আছেই, বজ্রপাতও কম আতঙ্ক তৈরি করিতেছে না। আবহাওয়ার পরিবর্তনই বজ্রপাত বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ইহাতে কৃষকরা অধিক হারে মারা যাইতেছেন। পাহাড়ি ঢল ও বৈরী আবহাওয়ায় গোলায় ধান তুলিতে বজ্রপাতের হুমকি লইয়াই মাঠে কাজ করিতেছেন কয়েক লক্ষ কৃষক। সম্প্রতি বজ্রপাতে এক দিনেই মারা গিয়াছে ১৩ জন। বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসাবে ঘোষণা করা হয় ২০১৫ সালে; কিন্তু পরিস্থিতির এখনো উন্নতি হয় নাই। বজ্রপাতের পূর্বাভাস প্রদান ও সচেতনতার উপর আমাদের অধিক জোর দেওয়া জরুরি।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বত্সর গড়ে ৮০ হইতে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডাব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বত্সর মার্চ হইতে মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। বত্সরে দেড় শতের মতো লোকের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হইলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ৫০০ হইতে ১ হাজার। এমনকি বিশ্বে বজ্রপাতপ্রবণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয়। গবেষকরা বলিতেছেন, আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থানই ইহার জন্য দায়ী। এই দেশের একদিকে রহিয়াছে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর, যেইখান হইতে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসিতেছে। অন্যদিকে উত্তরে রহিয়াছে পাহাড়ি এলাকা ও হিমালয় পর্বত, যেখান হইতে আসিতেছে ঠান্ডা বাতাস। এই গরম ও ঠান্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করিতেছে। এই জন্য সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া বজ্রপাতের ঝুঁকিতে রহিয়াছে; কিন্তু সচেতনতার কারণে আমাদের প্রতিবেশী দেশ যেমন—ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে বজ্রপাত হইলেও মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক গবেষণায় দেখা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ উঁচু গাছ যেমন—তালগাছ, বটগাছ ইত্যাদি উজাড় হইয়া যাইবার কারণেও বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িতেছে।
অতএব, বজ্রপাত হইতে আমাদের রক্ষা পাইতে হইলে বজ্রপাত অধিক হয়—এমন এলাকা সুনির্দিষ্ট করিয়া তৈরি করিতে হইবে নিরাপদ বলয়। এই সকল এলাকায় স্থাপন করিতে হইবে লাইটেনিং অ্যারেস্টার। বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ইহা চাহিলেই আমরা বন্ধ করিতে পারিব না। তবে ইহা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কিছু নিয়মকানুন মানিয়া চলা দরকার। যেমন—বেশি বেশি তালগাছসহ উঁচু গাছ লাগানো, আকাশ মেঘলা থাকিলে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, বড়ো গাছ, টিনের খুঁটি ইত্যাদি পরিহার করা, মোবাইল ফোন, টিভি-ফ্রিজ বন্ধ করা, ধাতব বস্তু (কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ, জানালার গ্রিল প্রভৃতি) এবং অধিক পানি ও খোলা স্থান হইতে দূরে থাকা, ঘরের জানালার কাছে উঁকি না দেওয়া, বজ্রপাতের সময় গাড়ি বাড়ির বারান্দা বা ছাউনির নিচে রাখিয়া অপেক্ষা করা, খোলা স্থানে একাধিক লোক পাশাপাশি না থাকা, জরুরি প্রয়োজনে বাহিরে যাইতে হইলে রাবারের জুতা ব্যবহার করা, তাত্ক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিত্সা সম্পর্কে অবগত থাকা ইত্যাদি।
