বিদেশি শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা বিপজ্জনক পদক্ষেপ

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২০, ২২:১৭

আনুশে হোসেন

বিদেশি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার বিষয়টি আমার নিজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিষয়। আমেরিকায় বিশ্বমানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী পড়তে আসেন। আমিও তাদের মতোই ১৯৮৯ সালে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলাম, যখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। আমার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে, বাংলাদেশের ঢাকা থেকে পাড়ি জমিয়ে আমি আমার নতুন একটি জগত্ তৈরি করেছিলাম শার্লটসভিলে।

আমার বাবা, যিনি নিজেও আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, তিনি আমেরিকায় পড়াশোনার ব্যাপারে সব সময়ই কট্টর সমর্থক। কারণ তিনি মনে করেন, উচ্চশিক্ষায় আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বসেরা। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমেরিকাকে চিনতাম কেবল মানচিত্রে, তখনো আমি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্কটটি চিনতে পারতাম, যেখানে আমার বাবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। জর্জটাউন স্মৃতিচিহ্নগুলো ছিল আমাদের পারিবারিক ফোনের কোবাল্ট ব্লু পেপারওয়েটের মতো (এটি ছিল সেলফোনের আগের যুগ) এবং আমার বাবার কালো চামড়ার আরামকেদারার নেভি নীল ও ধূসর বালিশটিও আমার শৈশবের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

আমার বাবা তার চারটি মেয়েকেই আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন, এটা ছিল গত শতাব্দীর আশির দশকের ঘটনা। উচ্চশিক্ষা এমন একটি জিনিস, যা মেয়েদের জন্য তেমন বিবেচনা করা হতো না এবং সে সময় বেশির ভাগ পরিবার তাদের মেয়েদের স্কুল কিংবা স্নাতক শেষ হতে না হতেই বিয়ে দিয়ে দিত।

আমার এবং বোনদের জন্য আমেরিকাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করাটা ছিল বিরাট পরিবর্তনশীল ঘটনা। ইউভিএ থেকে আমাদের তিনটি ডিগ্রি আছে, জর্জটাউনের একটি, যেখানে আমার বোনও আমার বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পড়ালেখা করেছে, আরেকজন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমার বাবার দৃঢ় বিশ্বাস, আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তার মেয়েদের জীবনের পথ অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। সুতরাং এখন যখন ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি শিক্ষার্থীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়া থেকে বিরত রাখার জন্য নতুন নির্দেশিকা ঘোষণা করেছে যে, করোনা মহামারি থেকে নিরাপদ থাকতে যদি কোনো শিক্ষার্থী এই ফল-সেমিস্টারে শুধু অনলাইনে কোর্স করে থাকে, তাহলে সে আমেরিকায় থাকতে পারবে না—তখন আমি নিজের অভিজ্ঞতা এবং ১ মিলিয়নেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী সম্পর্কে ভাবছিলাম। ভাবছিলাম যে, আমার মতো তারাও তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে তাদের জীবনের পথ পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন।

নতুন নিয়ম নিয়ে বুধবার ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে হার্ভার্ড ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে যে এই নির্দেশনাটি প্রায় ৫ হাজার বিদেশি শিক্ষার্থীকে বিপদে ফেলবে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ল্যারি বাকো বলেছেন, ‘আদেশটি বিনা নোটিশে আনা হয়েছিল—এর নিষ্ঠুরতা কেবল তার অদূরদর্শিতাকে ছাড়িয়ে গেছে।’ এটি প্রতীয়মান হয়—শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অন্যদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনা না করেই ট্রাম্প এই সেমিস্টারে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তাদের অন-ক্যাম্পাসের শ্রেণিকক্ষগুলো খুলে দিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চাপ দিয়েছেন।

যখন আমেরিকা কোভিড মহামারির মধ্যগগনে বিরাজ করছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি শিক্ষার্থীদের টার্গেট করাটা কেবল অহেতুক নিষ্ঠুরতা নয়, বিপজ্জনকভাবে নির্বুদ্ধিতাও বলা যায়। তবে আমেরিকাতে আগত যে কোনো এবং সব বিদেশিকে লক্ষ্য করে প্রেসিডেন্টের আদর্শের সঙ্গে এটি খাপ খায়। অর্থাত্ ট্রাম্প এখন অ্যাসাইলাম, বৈধ অভিবাসনের পর শিক্ষার ক্ষেত্রেও খড়্গহস্ত হচ্ছেন।

কেন এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এই দিকে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত? কারণ আন্তর্জাতিক ভিসায় আমেরিকা আসা শিক্ষার্থীরা আমেরিকাটিকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে এবং আমেরিকানদেরও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে। আমেরিকার চারপাশে তাকান। আমেরিকার ডাক্তার কারা? চিকিত্সা-গবেষক কারা? দেশের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী কারা?

একজন আমেরিকান নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, আমেরিকাকে শক্তিশালী করতে কারা কাজ করছে?

আসল বিষয়টি হলো ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা এটি স্বীকার করতে চান না যে, অভিবাসন হলো পারস্পরিক উপকারী এবং সুন্দর একটি সম্পর্ক। এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরা সেই প্রক্রিয়ার একটি সুন্দর অংশ। বিদেশি শিক্ষার্থীরা আমেরিকাকে ততই সমৃদ্ধ করে, যতখানি আমেরিকা আমাদের সমৃদ্ধ করে।

আমার ইউভিএ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হওয়ার ১৮ বছর পরে আজ আমি একজন ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আমেরিকাতে আমি যে প্রথম আমেরিকান বন্ধু বানিয়েছিলাম, আমার কলেজের সেই রুমমেটরা এখনো, ২০ বছর পরেও, আমার সেরা বন্ধু। সেই গার্লফ্রেন্ডদের মধ্যে একজন হলেন আমার মেয়ের গডমাদার।

আজ যখন আমি ইস্তাম্বুল থেকে এল সালভাদোর হয়ে পাকিস্তান ভ্রমণ করি, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমার সাবেক বিদেশি ছাত্র বন্ধুদের দেখতে পাই, যারা পড়ালেখা করেছেন আমেরিকার কলেজ থেকে। এমনকি এখনো আমার ইউভিএ-র বিদেশি শিক্ষার্থী-ভর্তির সাবেক ডিনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগেই আমি কিছু নবীন মেধাবী শিক্ষার্থীকে তার কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম ইউভিএতে ভর্তির ব্যাপারে তার গাইডেন্স পেতে।

আমি যখন দুই বছর পরে আমার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলাম তখন লন্ডনের ইউভিএ প্রাক্তনীদের ক্লাবের মাধ্যমেই আমি একটি নতুন শহরের ইউভিএ গ্র্যাজুয়েটদের সন্ধান করতে পারি। এবং তাদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম, যেখানে আমি কাউকে চিনতাম না। আজও কর্মক্ষেত্রে বা পেশাদার ইভেন্টে, আমি যদি কোনো ইউভিএ প্রাক্তনীকে দেখি তবে সঙ্গে সঙ্গে আমরা মিলে যেতে পারি। 

আমার বক্তব্যটি হলো বিদেশি শিক্ষার্থী হিসাবে আমেরিকায় পড়াশোনাটা কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অভিজ্ঞতার কথা। এটি একই সঙ্গে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোর্স সম্পন্নের পাশাপাশি নতুন দেশে থাকার অভিজ্ঞতা এবং আমেরিকান সংস্কৃতি সম্পর্কে শেখার বিষয়।

আমেরিকান শিক্ষাব্যবস্থা একটি সুন্দর, বহুমাত্রিক এবং বহু স্তরযুক্ত একাডেমিক অভিজ্ঞতা, যা স্পষ্টভাবেই বলা যায়, বিশ্বের অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমার আমেরিকান ডিগ্রি বাদ দিলে আমার অবস্থান কোথায়, আমি জানি না। আমি নিশ্চিতভাবেই আমার কাজ ছাড়া ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকি না, আমেরিকায় বসবাসরত আমার আমেরিকান স্বামী ও আমার আমেরিকান কন্যাদের ছাড়া আমি অবশ্যই আমেরিকার নাগরিক হতে পারি না।

এফ-১ স্টুডেন্ট ভিসা কেবল এক টুকরো কাগজ এবং আপনার বিদেশি পাসপোর্টের স্ট্যাম্প নয়, এটি বিশ্ব জুড়ে সব বয়সের সেরা ও উজ্জ্বল কিছু শিক্ষার্থীর স্বপ্ন এবং তাদের পিতামাতার স্বপ্নের প্রতিনিধি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাবতে পারেন যে, এই নতুন দিকনির্দেশনায় তিনি কেবল বিদেশি ও অভিবাসীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন, তবে ট্রাম্প-সম্পর্কিত বেশির ভাগ নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলো শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : অদ্বয় দত্ত

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ