এম এ খালেক
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (ইসিএনইসি) সভায় বক্তব্য উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলকে পরামর্শ দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের পর ইস্যুটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এমন এক সময় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ঋণ গ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলেছেন যখন পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ করোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত আর্থিক দুরবস্থা মোকাবিলা করতে গিয়ে তাদের রিজার্ভ খুইয়ে বসার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে হলেও বাংলাদেশ তার রিজার্ভ স্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী গতি ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের রেকর্ড পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে রিজার্ভ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একমাত্র ভারত বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে। ১২ জুন, ২০২০ তারিখে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৫০৭ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১২ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি পঞ্জিকা বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেশির ভাগ সেক্টরের সূচক নিম্নমুখী থাকলেও জনশক্তি রপ্তানি খাতে রেমিট্যান্স আহরণের হার ছিল তুলনামূলক ভালো। গত মাসে (জুন, ২০২০) বাংলাদেশ ১৮৩ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করেছে। এটা ছিল কোনো একক মাসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর ধারাবাহিক তৃতীয় মেয়াদ অতিক্রম করছে। এই পুরো সময়টা ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরের মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রবণতা চলছে অব্যাহতভাবে। বিশ্বের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ এ ব্যাপারে একমত যে, একটি দেশের তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থাকলেও তাকে সন্তোষজনক বলে মনে করা যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংরক্ষণ করছে তা দিয়ে আমাদের ৯ থেকে ১০ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যেতে পারে। ’৮০র দশকে এক সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ১২৫ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে এসেছিল। তখন উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশই বৈদেশিক ঋণ ও আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে মেটানো হতো। যে কোনো দেশের জন্যই স্ফীত রিজার্ভ স্বস্তিদায়ক অবস্থার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ গত অনেক দিন ধরেই স্ফীতি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংরক্ষণ করে চলেছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রায় শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের মাধ্যমে একটি দেশের আর্থিক সামর্থ্য এবং শক্তি অনুধাবন করা যায়। জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঠিক রাখা, স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা মেটানোর জন্য আবশ্যিক পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থাকতে হয়। উন্নত দেশগুলো কোনো দেশকে আর্থিক সহায়তা বিশেষ করে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণকে বিবেচনায় নিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভকে একটি দেশের ‘এক্সটার্নাল অ্যাসেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। একটি দেশ চাইলেই তার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্ফীত করতে পারে না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বেশির ভাগ সময়ই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্বল্পতায় ভোগে। আশার কথা এই যে, বাংলাদেশ সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার স্ফীত রিজার্ভ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তবে আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অলস স্ফীত সব সময় কাম্য নয়। আমাদের ভাবতে হবে কী করে স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়। বিশেষ করে বিনিয়োগ কার্যক্রমে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ব্যবহার করা গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃজনে সহায়ক হতে পারে।
এমন এক অবস্থায় দেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বিনিয়োগে নিয়ে আসার জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পর ইস্যুটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কীভাবে বিকল্প ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন। সরকার যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে চায় তাহলে তা নিতেই পারে। সে অধিকার সরকারের রয়েছে। এভাবে ঋণ গ্রহণ কোনো অনৈতিক কাজ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গৃহীত ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হবে? যদি এই ঋণের অর্থ দিয়ে ত্রাণ বিতরণ কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে সেটা মোটেও সমর্থনযোগ্য হবে না। বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে রিজার্ভ থেকে গৃহীত ঋণের অর্থ ব্যবহার করা ঠিক হবে না। কারণ এসব প্রকল্প থেকে রিটার্ন আসতে অনেক দিন লাগবে। স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন কাজে রিজার্ভ মানি ব্যবহার করা যেতে পারে। এটা অবশ্য ইতিপূর্বে সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে করেছে। দেশে কোনো বিশেষ পণ্যের সংকট দেখা দিলে সরকার তাত্ক্ষণিক আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারে। সরকার সীমিত পরিসরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারে। তবে আমাদের এখন রিজার্ভের বিকল্প ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। বিভিন্ন দেশের বন্ডে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এমন কি যে সব দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ স্বল্পতা রয়েছে সেই সব দেশের জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিযুক্ত বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এমন কি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বল্পকালীন চাহিদা মেটানোর জন্য চলতি ঋণ প্রদান করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে কোনো অভ্যাসগত ঋণখেলাপি যাতে এই অর্থ নিতে না পারে। বাংলাদেশের এক শ্রেণির উদ্যোক্তা আছেন যারা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা নানাভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। ফলে নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না। মূলত এদের কারণেই ব্যাংকিং সেক্টর মারাত্মক দুরবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন জরুরি মুহূর্তে কল মানি মার্কেটে বিনিয়োগ করে থাকে। অনেকটা সেভাবেই রিজার্ভ থেকে অর্থ বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তবে যেখানেই রিজার্ভ মানি বিনিয়োগ করা হোক না কেন তা যেন বৈদেশিক মুদ্রায় ফেরত দেওয়া হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মুদ্রার বিনিময় হার তারতম্যজনিত সমস্যায় পড়তে পারে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে রিজার্ভ অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্ব স্ব ব্যাংক গ্যারান্টি নেওয়া যেতে পারে। অর্থাত্ উদ্যোক্তা যে ব্যাংকে লেনদেন করেন সেই ব্যাংক উদ্যোক্তার অনুকূলে ঋণ পরিশোধের গ্যারান্টি দেবে। যাতে প্রদত্ত ঋণের কিস্তি আদায় কখনোই বিঘ্নিত না হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ইস্যু। চাইলেই একটি দেশ সব সময় তার রিজার্ভ অর্থ বাড়াতে পারে না। রিজার্ভ অর্থ সাধারণত সংরক্ষণ করা হয় একটি দেশের জরুরি চাহিদা পূরণের জন্য। নিত্যপণ্য আমদানি অনেকটাই কমে গেছে। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মূলত এসব কারণেই রিজার্ভের স্ফীতি এতটা বেড়েছে। করোনা সংক্রমণের মাত্রা কমে এলে আমদানি ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যাবে। শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু পণ্য এবং জনশক্তি রপ্তানি আয় তাত্ক্ষণিকভাবে বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের পরিমাণ কমে যেতে পারে। সেই অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে টান পড়াটাই স্বাভাবিক। কাজেই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করুক আর বিকল্প বিনিয়োগে উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক খুব ভেবেচিন্তে তা করতে হবে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিষয়ক কলাম লেখক
