শুধু ডিগ্রিধারী নয়, চাই কর্মকুশল সুনাগরিক

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২০, ২২:১৯

সুমনা মৃধা

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ননির্ভর হয়ে যাওয়ার কারণেই আজ আমরা উচ্চ ডিগ্রিধারী নাগরিক পেলেও পাচ্ছি না কর্মকুশল সুনাগরিক। যদি তা-ই না হতো তাহলে এতসংখ্যক উচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষিতের সংস্পর্শে এসেও সোনার বাংলা দুর্বৃত্ত, লুটেরা ধনিক-বণিক শ্রেণির দেশে পরিণত হতো না। সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত জাল পেতে বসত না সন্ত্রাসবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, আদর্শহীনতা, হিংস্রতা, ভোগবাদিতা। আমাদের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, করোনা পরিস্থিতিতে তা আমরা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত অসহায়ের ত্রাণ চুরি থেকে শুরু করে এমন কোনো ঘৃণ্য কাজ বাকি নেই, যা আমাদের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে না।

একটা সময় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ম্যাট্রিকুলেশন, ইন্টার পাশও বিরাট অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন শিক্ষা অর্জন সর্বজনীন ছিল না, অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এখন ঘরে ঘরে অর্জিত হচ্ছে উচ্চতর ডিগ্রি। কারণ শিক্ষার অনেক দ্বার উন্মোচিত হয়ে শিক্ষা অর্জন সহজতর হয়েছে এবং মানুষ বুঝতে পেরেছে শিক্ষা সবার জন্য প্রয়োজনীয়। ফলে বেড়েছে শিক্ষার হার, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষিতের সংখ্যাও। দেশের উচ্চপদগুলোতে আসীন হচ্ছেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত উচ্চতর ডিগ্রিধারীরা। দেশ জুড়ে শিক্ষিতের এত আধিক্য এবং জাতির মেরুদণ্ডসম শিক্ষার সন্তোষজনক হার বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার আগ্রাসনে আমরা মেরুদণ্ডহীনের মতো কুঁজো হয়ে পড়ছি কেন? গলদ কি তাহলে আমাদের শিক্ষায়? আমরা কি কেবল ডিগ্রিধারী হচ্ছি? শিক্ষিত হচ্ছি না?   

একটি দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক। মাঠের কৃষক থেকে শুরু করে সুসজ্জিত অফিসে চাকরিরত ডিগ্রিধারী ব্যক্তি সবাইকে হতে হবে উদারনৈতিক মনোভাবসম্পন্ন নিবেদিত কর্মী।

একজন মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ প্রোথিত করার সর্বোত্কৃষ্ট সময় হচ্ছে তার জন্মের পর থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত। এই সময়টাতেই শিশুর মস্তিষ্কের সবচেয়ে বেশি বিকাশ ঘটে। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র হচ্ছে তার পরিবার। শিশুর মন ও আত্মার সুষম বিকাশ ও পরিচর্যায় পরিবারকে বিশেষ যত্নবান হতে হবে।

শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য তথা শিশুদের বিকাশকে কার্যকরী ও ত্বরান্বিত করে তাদের পূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, যেন তারা তাদের চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে উন্নততর ও সার্থক বিধান ও অভিযোজন করতে পারে—শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি কতজন শিক্ষকই বা আমলে রাখছেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জীবনের মাধুর্য ও সত্য উপলব্ধিকরণের চর্চার পরিবর্তে চর্চা হচ্ছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক অধিক নম্বর তোলার কৌশল।

শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের উচিত হবে সন্তানের পরীক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন না হয়ে তাদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানোর দিকে মনোযোগী হওয়া। লকডাউনের এই সময়টা ব্যয় হোক সন্তানকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রয়াসে। তাদের মধ্যে বাড়াতে হবে ভালোবাসার চর্চা এবং দেশ ও জাতিকে ভালোবাসার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। বিলাসবহুল জীবনযাপন ও অর্থবিত্তের মোহে আমরা নিজেদেরকে ভালোবাসতেও ভুলে গেছি। মানুষ নিজেকে ভালোবাসলে ভালোবাসত তার শেকড়কে, শেকড়কে ভালোবাসলে ভালোবাসত মাটিকে, মাটিকে ভালোবাসলে ভালোবাসত দেশ ও দেশের মানুষকে। তাহলে দেশের টাকা আর অবৈধভাবে লুট হতো না, পাচার হতো না বিদেশে। মানুষ বুঝতে পারত অন্যকে ঠকিয়ে যে জেতা তা আসলে জেতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের জন্য হেরে যাওয়া; বাঁচা শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও বাঁচতে হয়।

গোটা পৃথিবীই যেখানে স্তব্ধ হয়ে আছে, সেখানে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক বছরের জন্য বন্ধ থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়ব না। বরং নীতি-নৈতিকতাবিবর্জিত একটি জাতি গড়ে ওঠার অভিশাপ আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। এমতাবস্থায় ক্লাস-পরীক্ষার জন্য সরকারকে অহেতুক চাপ দেওয়া ফলপ্রসূ কোনো কর্ম নয়। তার চেয়ে বরং এই লকডাউনে প্রতিটি পরিবারই হয়ে উঠুক এক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা নৈতিকতার কারখানা। সেই মানুষ তৈরির কারখানার কারিগর হবেন স্বয়ং অভিভাবকেরা। সেখানে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা করে সচ্চরিত্র গঠনের মাধ্যমে পবিত্র জীবনের দিকে ধাবিত হবে। মানুষ তৈরির কারিগরে গলদ থাকা কাম্য নয়। তাই অভিভাবককেও করতে হবে শুদ্ধ মানুষ হওয়ার চর্চা।                                                                                                               

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়