বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত দেড় বছরে ৪২ জন খুন হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মোট ২৪টি ঘটনায় মোট ৪২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যই বেশি। তবে বেশ কয়েকজন বাঙালিও রয়েছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে বান্দরবান জেলায় প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের গুলিতে ছয় জন নিহত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষণা সংস্থা সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জেএসএসের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণের মতো সমাজবিরোধী কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য জেএসএস ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে তারাই জেএসএসের বড় টার্গেটে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস ত্যাগ করে অন্য সংগঠনে যোগ দেওয়া বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসাটা অনেক বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জেএসএসের হাইকমান্ড। সরকারের সম্প্রীতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশীদার হতে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছে তারাই জেএসএসের রোষানলে পড়েছে।গবেষণায় দেখা গেছে, গত দেড় বছরে জেএসএস (মূল)-এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ১৫ জন করে এবং রাঙামাটিতে ১২ জন নিহত হয়েছে। নিহত ৪২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুবরণকারীর মধ্যে শাসকদল আওয়ামী লীগের ৯ জন নেতাকর্মী রয়েছেন। এছাড়া নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি ব্যক্তি আট জন, জেএসএস (সংস্কারপন্থি গ্রুপ)-এর ১৪ জন, এমএনপি পাঁচ জন, জেএসএস মূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একজন এবং চার জন সাধারণ পাহাড়ি মৃত্যুবরণ করেছেন।
খাগড়াছড়িতে নিহত ১৫ জনের মধ্যে জেএসএস সংস্কারপন্থি সাত জন এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি আট জন। বান্দরবানে নিহত ১৫ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের চার জন, জেএসএস সংস্কারপন্থি ছয় জন, এমএনপি দুই জন ও তিন জন সাধারণ পাহাড়ি। রাঙামাটিতে নিহত ১২ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের পাঁচ জন, এক জন জেএসএস সংস্কারপন্থি, তিন জন এমএনপি, এক জন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জেএসএস (মূল) একজন এবং একজন সাধারণ পাহাড়ি।
সিএইচটিআরএফের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ ইত্তেফাককে বলেন, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হোক এটা সন্তু লারমা চান না। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তপাত বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও সন্তু লারমার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তার নির্দেশে জেএসএস তাদের সকল অস্ত্র জমা দেয়নি।
