দ্বিতীয় দফা বন্যায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২০, ২২:৫০

প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তা, সুরমা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, জাদুকাটা, আত্রাইসহ আরো কয়েকটি নদনদীর পানি অনেক জায়গায় বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে গত ২৪ ঘণ্টায় দ্বিতীয় দফা বন্যায় গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, রংপুর, জামালপুর, শেরপুরসহ আরো কয়েকটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৪ লাখ মানুষ। তিস্তার পানির তোড়ে গঙ্গাচড়ায় সড়ক ও বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে পানি।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, আবারও হু হু করে বাড়ছে জেলার সব নদনদীর পানি। ব্রহ্মপুত্র নদসহ যমুনা, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। রবিবার বিকাল ৩টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপত্সীমার ৩০ সেন্টিমিটার, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই আবারও বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন জেলার চার           উপজেলার ২৬ ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ। তারা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, সড়ক ও সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে। এদিকে নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা। পানির চাপে হুমকিতে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, জেলায় ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমর, তিস্তাসহ সব কয়টি নদনদীর পানি বাড়ছে। দ্বিতীয় দফা বন্যায় বানভাসি মানুষদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। নতুন করে আবারও জেলার ৪ শতাধিক চর-দ্বীপচরের নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। কুড়িগ্রাম সদরের কালুয়ার চরের জয়কুমার ও হলোখানার সারডোব এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ১৯টি পয়েন্টে ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে। রবিবার বিকালে ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপত্সীমার ৬৪ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপত্সীমার ২২ সেন্টিমিটার, দুধকুমরের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই পানি বৃদ্ধি আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে এবং ৭-১০ দিন মাঝারি আকারের বন্যা থাকবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, দ্বিতীয় দফা বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন পৌরসভাসহ ছাতক উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের ২ লাখ মানুষ। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। রবিবার বিকাল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি ছাতক পয়েন্টে বিপত্সীমার ১৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার বিনবিনা এলাকায় তিস্তার পানির তোড়ে একটি রাস্তা ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তাছাড়া গজঘণ্টা এলাকায় সদ্যনির্মিত একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় সেখানেও কিছু নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে নতুন করে ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল রবিবার বিকাল ৩টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ি উপজেলার যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়ে আবারও হাজারও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ উঁচু বাঁধে, আবার অনেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার ২০ গ্রামের শতশত মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ২০ হেক্টর জমির বীজতলা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। সোমেশ্বরী, মহারশি ও কালঘোষা নদীর পানি রবিবার বিপত্সীমার কাছাকাছি স্থান দিয়ে প্রবাহিত হয়।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কাজীপুর উপজেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী, কাজীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, প্রথম দফা বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে আবারও কলমাকান্দা উপজেলার দুইশতাধিক গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। রবিবার নদী অববাহিকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৩০ হাজার মানুষ। তিস্তা ব্যারাজের সব কয়টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে।

সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, আত্রাই নদীতে পানি বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে উপজেলার আনন্দনগর, বিলদহর, নুরপুর, ভুলবাড়িয়া, একলাসপুর গ্রামের বেশকিছু বাড়ি-ঘর, রাস্তা, দোকানপাট ডুবে গেছে।

মদন (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, মগড়া ও ধনু নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার গোবিন্দশ্রী গুচ্ছগ্রামের ৫০ পরিবারসহ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।                        

সিলেট অফিস ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুরমা ও কুশিয়ারা অববাহিকায় পানি বৃদ্ধিতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের ১৭ উপজেলার আড়াই ‘লক্ষাধিক বানভাসি মানুষের কষ্টের শেষ নাই। ভারতের বরাক নদী দিয়ে প্রবল বেগে পানি নামা অব্যাহত রয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় সেখানে পানি বৃদ্ধি পেয়ে  সুরমা-কুশিয়ারার মিলন স্থল অমলসিদে পানি বিপত্সীমার দশমিক ৩১ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। সিলেট নগরীর উপশহর ও নদী তীরবর্তী বহু রাস্তা ও বাড়িঘরে বন্যার পানি। নৌকা সিলেটের সড়কে চলতে দেখা যায়।