সমগ্র বিশ্বে করোনা ভাইরাস দেখা দিয়াছে বিভীষিকাময় এক মহামারি হিসাবে। ইহার শেষ কোথায় তাহা কেহ জানেন না। এই মহামারি হইতে রক্ষায় স্বাভাবিকভাবে মানুষের মধ্যে করোনা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা বাড়িয়াছে। এই সকল সামগ্রীর মধ্যে রহিয়াছে—মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, হেড কাভার, শু-কাভার, গগলস, ফেস শিল্ড, গাউন ইত্যাদি। এই সুরক্ষাসামগ্রীর বড় একটি অংশ বর্তমানে রাস্তাঘাটে উন্মুক্ত জায়গায় ফেলিয়া দেওয়া হইতেছে। এই সকল সামগ্রী পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কেননা ইহা হইতেও করোনা ভাইরাস ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কা রহিয়াছে; কিন্তু এই ব্যাপারে আমাদের মধ্যে তেমন কোনো সচেতনতা দেখা যাইতেছে না। শুধু তাহাই নহে, এই সকল বর্জ্য আলাদা না করিয়া অন্যান্য বর্জ্যের সহিত সংগ্রহ করা হইতেছে। পরিবহন ও ডাম্পিংও করা হইতেছে ইহার সহিত। অধিকাংশ বর্জ্য সংগ্রহকারীর এই ব্যাপারে সেই ধরনের কোনো ধারণা নাই। তাই করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় এই সকল বর্জ্যের পৃথক ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা ও বিশেষ নির্দেশনা জারি করা একান্ত দরকার।
সম্প্রতি নেটওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ (এনসিসিবি) এক জরিপ প্রতিবেদনে বলিয়াছে, শুধু রাজধানীতেই প্রতি মাসে ৬ হাজার টনেরও অধিক করোনা বর্জ্য জমে; কিন্তু সিটি করপোরেশনের ৬১ দশমিক ১ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহকারীর এই সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নাই। অথচ ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার করোনা বর্জ্য রাখে আলাদা ঝুড়িতে। তাহার অর্থ রাজধানীবাসীর অর্ধেক মানুষ সচেতনতার পরিচয় দিলেও সংগ্রহকারীরা সচেতন নহেন বা এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া দরকার, তাহা নাই অথবা নির্দেশনা থাকিলেও তাহা কার্যকর করিবার কোনো উদ্যোগ নাই। একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, রাজধানীর ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ এই করোনা দুর্যোগকালে ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করেন। ইহা একটি আশাব্যঞ্জক দিক। তবে তাহারা ইহা যত্রতত্র ফেলিতে পারেন না। এই ব্যাপারেও আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। কেননা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হইলে তাহাদের মাধ্যমে আরো অনেকে আক্রান্ত হইতে পারেন। শুধু ঢাকা শহর নহে, সমগ্র দেশেই এই ধরনের বর্জ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করিতেছে। এই সকল সামগ্রী ভূমি, জলাভূমি, নদী ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকারক।
করোনাকালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আমাদের আরো মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। যাহারা ইহা সংগ্রহ করিবেন, তাহাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিতে হইবে। ধরনভেদে প্রতিটি বর্জ্য আলাদা করিবার ব্যবস্থা লইতে হইবে। করোনা বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং ও ধ্বংস করিবার ব্যবস্থা লইতে হইবে। এই জন্য সমন্বিত ‘সংক্রামক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মনিটরিং সেল’ গঠন করা যায়। চিকিত্সা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা-২০০৮ নামে যে বিধিবিধান রহিয়াছে তাহার বাস্তবায়ন আবশ্যক। প্রয়োজন সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়নও। গত চার মাসের করোনাকালে দেশে জমিয়া উঠিয়াছে বিপুল পরিমাণ কোভিড বর্জ্য। দ্রুত সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনিতে পারিলে এই সকল বর্জ্যই করোনা ছড়ানোর বড় উত্স হইয়া উঠিতে পারে।
