গত তিন মাসের বেশি সময় ধরে করোনার কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রয়েছে। কবে চেম্বার চালু হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এতে জীবনরক্ষায় মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত জটিল রোগীরা। জটিলতা বাড়লেও তারা চিকিত্সককে দেখাতে পারছেন না। আবার করোনা সংক্রমণের ভয়ে হাসপাতালেও চিকিত্সা নিতে পারছেন না এসব জটিল রোগী। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কিছু চললেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের প্রাইভেট চেম্বার চালু হচ্ছে না।
চন্দনাইশের মহিউদ্দিন আহমেদ একটি বেসরকারি রি-রোলিং মিলে চাকরি করেন। প্রায় দেড় বছর আগে তিনি হূদরোগের সমস্যায় চমেক হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের মাধ্যমে শরীরে রিং স্থাপন করেছেন। রিং স্থাপনের কয়েক মাস পর থেকে মাঝে-মধ্যে তার সমস্যা দেখা দেয়। এখন ঐ চিকিত্সকের চেম্বার বন্ধ থাকায় তিনি চিকিত্সা নিতে পারছেন না। জুনিয়র কোনো চিকিত্সক থেকেও চিকিত্সা নিতে পারছেন না। ফলে প্রতি মুহূর্ত জীবন মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার ৬৫ বছরের বৃদ্ধা রবিউল হোসেন ক্যান্সারে ভুগছেন। তিনি চমেক হাসপাতালে এক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অধীনে দীর্ঘদিন যাবত্ চিকিত্সা নিচ্ছেন। গত দুই দিন ধরে নগরীর একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছেন ঐ চিকিত্সকের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু ঐ চিকিত্সকের প্রাইভেট চেম্বার কয়েক মাস যাবত্ বন্ধ রয়েছে। চমেক হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ করে জানতে পেরেছেন চিকিত্সক ছুটিতে রয়েছেন। চিকিত্সকের মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।
হূদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি, লিভার, জরায়ু, ডায়াবেটিস, অর্থোপেডিক্স ও গাইনিসহ আক্রান্ত জটিল রোগীরা চিকিত্সা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। সরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিকে রোগী ভর্তি করে চিকিত্সা চলছে। ক্লিনিকে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা কলে চিকিত্সা দিচ্ছেন বলে ক্লিনিক মালিকরা দাবি করছেন। কিন্তু তারা করোনার অজুহাতে প্রাইভেট চেম্বারে চিকিত্সা বন্ধ রেখেছেন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ফজলে রাব্বি ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের কীভাবে চেম্বারমুখী করা যায় তা নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। সভায় চিকিত্সকদের চেম্বারমুখী করতে বিএমএ সভাপতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন অনেক চিকিত্সক প্রাইভেট চেম্বার চালু করেছেন। বিষয়টি যেহেতু ব্যক্তিগত তাই তাদের চেম্বার চালুর জন্য উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বেসরকারি হাসপাতাল মালিক সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কাসেম ইত্তেফাককে বলেন, ‘কলে সবাই আসছেন না। কেউ কেউ কলে চিকিত্সা দিচ্ছেন। ক্লিনিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চিকিত্সা কার্যক্রম চলছে। তবে অনেক সময় রোগীরা রোগ গোপন রেখে মিথ্যা বলছেন। এতে চিকিত্সকরা করোনার সংক্রমণ থাকায় চেম্বারে রোগীকে চিকিত্সা দেওয়া নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের বয়স হয়েছে।’
বিশিষ্ট গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক প্রফেসর ডা. সাহানারা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি জুন থেকে চেম্বার চালু করার চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় চালু করছি না। তবে সীমিত আকারে গাইনি জটিল রোগীদের হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার সময় চেম্বারে দেখে দিচ্ছি। হাসপাতালের বহির্বিভাগেও জটিল রোগীদের চিকিত্সা দিচ্ছি। আবার প্রতিদিন মোবাইলে ১৫/২০ জন রোগীর চিকিত্সা পরামর্শ দিচ্ছি। তাছাড়া অনেক জুনিয়র চিকিত্সক চেম্বার করছেন। ফলে জটিল গাইনি ও প্রসূতি রোগীদের তেমন সমস্যা হচ্ছে না।’
বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘যারা ইয়ং চিকিত্সক তাদের নিয়মিত চেম্বার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের মধ্যে বেশির ভাগ চিকিত্সকের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চেম্বার করতে আগ্রহী হচ্ছে না। চেম্বারে চিকিত্সা দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’ স্বাচিপের পক্ষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘একটি সময় নির্ধারণ করে সীমিতসংখ্যক রোগীকে চেম্বারে চিকিত্সা দিতে আমরা চেষ্টা করছি। আমাদের চিকিত্সাব্যবস্থা প্রাইভেট চেম্বার নির্ভর। তাই মানবিক কারণে হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের চেম্বারে ফিরে আসা প্রয়োজন।’
