স্যার আইজ্যাক নিউটনের তৃতীয় সূত্রে বলা হইয়াছে, For every action, there is an equal and opposite reaction। ইহা আমরা যাপিত জীবনের নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার করিয়া থাকি। বাস্তবে আমরা দেখিতে পাই, কিছু কিছু অঘটনের পিছনে ছোট্ট একটি ইতিবাচক সংকেতের ইঙ্গিতও থাকে। ধরা যাউক, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের কৃতকর্মের কথাই। এখন পর্যন্ত রিপোর্ট অনুসারে তিনি যাহা করিয়াছেন তাহা অবশ্যই অপকর্ম এবং গর্হিত। এই ধরনের কৃতকর্ম মোটেই কাঙ্ক্ষিত নহে; কিন্তু তাহার কৃতকর্মের মধ্যেও ছোট্ট একটি বার্তা আমরা দেখিতে পাই, যাহা অন্যরকম করিয়া আমাদের ভাবিতে সাহায্য করে। কুয়েত ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তিনি বিভিন্ন সময়ে তাহার কর্মকাণ্ড চালাইয়া যাইতে কুয়েতের দুই এমপিসহ বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উেকাচ দিয়াছেন। জানা গিয়াছে, দুই এমপিকেই তিনি দিয়াছেন ১৫ কোটি টাকা! ঐ এমপিদ্বয় ও ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুয়েত সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছে। উল্লেখ্য, কুয়েত বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ এবং তাহাদের মুদ্রা কুয়েতি দিনার পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে মূল্যবান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেইখানে আইনও যথেষ্ট কঠিন।
কুয়েতের জনগণ এবং সরকার বরাবরই আমাদের দেশকে হতদরিদ্র বলিয়াই জানে। আমরা সেইখানে যাইব এবং শ্রমিকের কাজ করিব ইহাই সাধারণ ধারণা; কিন্তু এই দরিদ্র দেশের কাহারো ঘুষ দেওয়ার ক্ষমতা বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ কুয়েতের কেবিনেট পর্যন্ত পৌঁছাইয়া যাইবে ইহা কবে কে ভাবিয়াছিল! এখন শ্রমিকের দেশ চিন্তা করিবার পাশাপাশি কুয়েতের একজন নাগরিককে ইহাও ভাবিতে হইবে যে, বাংলাদেশের দুর্নীতির টাকা এতটাই শক্তিশালী যে, কুয়েতের সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের দিনার আয় করিয়াও লোভ সামলাইতে পারেন নাই।
বাংলাদেশিদের হাত প্রসারিত করিবার ক্ষমতার দিকে তাকাইলেও বুঝিতে হইবে—উহাও লম্বা হইয়াছে অনেক। ধনাঢ্য কুয়েতের মন্ত্রিসভা পর্যন্ত! বহুদিনের প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘মারি তো হাতি, লুটি তো ভান্ডার!’ পাপুল ভান্ডার লুটিয়াছেন; কিন্তু তাহার সহিত ইহাও তো ঠিক যে, লুটিয়া লইবার মতো ভান্ডার বাংলাদেশে তৈরি হইয়াছে! বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর বঙ্গবন্ধুর ভাষায় চাটার দল যাহারা ছিল তাহারা বড়জোর সাহায্য পাওয়া দুইখানা কম্বল চাটিতে পারিত; কিন্তু চাটিবার ভান্ডারখানা কত বড় হইয়াছে যে, কুয়েতের মতো দেশের এমপি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জিহ্বা বাড়াইয়া তাহাতে ভাগ বসাইতে পারেন! আমরা আবারও বলিতেছি, ইহা মোটেই কাম্য নহে এবং যথাযথ তদন্তসাপেক্ষে সঠিক বিচারই আমাদের কামনা; কিন্তু চক্ষু মুদিয়া ভাবিলে আমরা দেশের অগ্রসরের গতিও দেখি। করোনা ভাইরাস বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সমগ্র দেশকেই পিছাইয়া দিয়াছে; কিন্তু করোনার ঠিক পূর্বের অবস্থায় বাংলাদেশ যেইভাবে অগ্রসর হতেছিল তাহাতে যদি আমরা শুনিতে পাইতাম যে, বাংলার ঘুষের টাকা ক্রেমলিন বা হোয়াইট হাউজের দরজা দিয়া প্রবেশ করিয়াছে, তাহাতেও অবাক হইবার বিষয় থাকিত না। উহাতেও আমরা দুঃখ পাইতাম; কিন্তু অবচেতন মনে এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করিতাম যে, অর্থের জোর আমাদের বহু দূরে লইয়া গিয়াছে, তাহা কালো রাস্তা ধরিয়াই হউক আর সাদা রাস্তা দিয়াই হউক।
