অনিয়ম করিয়া পার পাওয়া যায় না

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২০, ২২:১৬

নড়াইলের পেড়লী ইউপি চেয়ারম্যান জারজিদ মোল্যার বরখাস্তের ঘটনা হইতে শিক্ষা লয় নাই নূতন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়া ইউপি সদস্য শাহাজান শেখ। জনাব শাহাজান হয়তো ভাবিয়াছেন—চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, ধরা না পড়িলেই হইল। আগের চেয়ারম্যান জারজিদ এই মহাবিদ্যা ঠিকমতো রপ্ত করিতে পারে নাই। নিশ্চয়ই অতি আত্মবিশ্বাস ভর করিয়াছিল নূতন চেয়ারম্যানের মনে। সেই কারণে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাইবার ১৫ দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার তালিকায় নিজের সচ্ছল সন্তান, ভাইবোন, আপন জামাই, ভাইপোসহ নিজ পরিবারের ২০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়া ফেলেন! এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন বেশ কয়েক জন সচ্ছল ব্যবসায়ীকেও। তাহাদের নিশ্চয়ই মনে হইয়াছে, সরকারি মাল দরিয়ায় তো ঢালিতেছেন না, নিজেদের মধ্যে তাহার অংশ বুঝিয়া লইতেছেন। ইহাতে দোষের কী!

ক্ষমতার নূতন স্বাদ পাইয়া জনাব শাহাজান সম্ভবত ভুলিয়া গিয়াছেন দুস্থদের চাউল আত্মসাতের অভিযোগে গত এপ্রিল মাসেই তাহাদের আগের চেয়ারম্যান জারজিদ মোল্যাকে স্থানীয় সরকার বরখাস্ত করিয়াছে। ইহার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র দেশের মতো নড়াইলেও করোনায় কর্মহীন অসচ্ছল পরিবারকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নগদ আড়াই হাজার টাকা করিয়া অনুদানের ঘোষণা করিলে শাহাজানের লোভের জিহ্বা চকচক করিয়া উঠে। ইহাই সুযোগ। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহাজান অসচ্ছল ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়া নিজের পরিবারের লোকদের নাম যুক্ত করেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বরখাস্ত হওয়া জারজিদ চেয়ারম্যানের লোকজন এবং নেতাকর্মী মিলিয়া ছয় শতাধিক সচ্ছল ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করেন বলিয়া পত্রিকান্তরে সংবাদ ছাপা হইয়াছে। প্রায় একই ঘটনা ঘটিয়াছে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার রসুলপুরে। রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রবিউল করিম দুলার নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠিয়াছে। সুবিধাভোগী ৭১১ জনের তালিকায় স্থান পায় নাই প্রকৃত দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষ। তাহাদের পরিবর্তে এলাকার সচ্ছল ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের তালিকায় রাখা হইয়াছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করিয়া রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলিয়াছেন, সহায়তা পাইবার যোগ্যরাই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হইয়াছেন। তবে তাহারা যে প্রকৃতই দরিদ্র, ইহা প্রমাণের দায়িত্ব ঐ চেয়ারম্যানের।

এই ধরনের অনিয়মের ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত করিয়া দেখিতে হইবে। একই সঙ্গে দেখিতে হইবে এই সকল জনপ্রতিনিধির ব্যাপারে প্রতিপক্ষ কেহ যেন প্রতিহিংসাবশত মিথ্যা অপবাদ না দেয়। বিষয়টি স্পর্শকাতর। কারণ, চাউল চুরি লইয়া ইতিমধ্যে সমগ্র দেশ তোলপাড় হইয়াছে। আমাদের দেশে দারিদ্র্য যেমন হ্রাস পাইয়াছে, তেমনি আমাদের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাইয়াছে। সকলেই নিশ্চয়ই চোর নহে এবং বিপুলসংখ্যক প্রকৃত দরিদ্র মানুষ চাউল এবং আর্থিক প্রণোদনা পাইয়াছেনও। ইতিমধ্যে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের ত্রাণ চুরি করিলে কঠোর শাস্তির কথা জানাইয়াছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলিয়াছেন, ‘আমরা যারা রাজনীতি করি আমাদের আরো বেশি দায়িত্ববোধ থাকতে হবে।’ প্রকৃতপক্ষে এই দায়িত্ববোধ না থাকিলে, জনগণকে সেবার মানসিকতা না থাকিলে রাজনীতিতে আসা উচিত নহে। জনপ্রতিনিধি হওয়া এত সহজ ব্যাপার নহে। অনিয়ম করিয়া পার পাওয়া যায় না, আজ হউক কাল হউক, ধরা পড়িতেই হয়। মনে রাখিতে হইবে, চুরিবিদ্যায় নিজের পতনেরই দস্তখত থাকে।