আমাদের এই ছোট্ট দেশের চাষযোগ্য এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি না থাকে—এই ব্যাপারে মাঝেমধ্যেই বিবৃতি দিয়া থাকেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। বিষয়টি নানা দৃষ্টিকোণ হইতে গুরুত্বপূর্ণ। লকডাউনে এখন ঘরবন্দি অনেকেই। শরীরে-মনে চাপিয়া বসিতেছে অবসাদ আর মানসিক ক্লান্তি। এই সময়টুকুও কাজে লাগানো যায় বাড়িতে ছাদবাগান করিয়া।
ঢাকা শহরে প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষের বসবাস। একজন লোক প্রতিদিন প্রায় ৫৫০ লিটার অক্সিজেন গ্রহণ করিয়া থাকে। সেই হিসাবে ঢাকার জন্য প্রতিদিন মোট ৯৩৫ কোটি লিটার অক্সিজেন দরকার। এই বিপুল পরিমাণ অক্সিজেনের উল্লেখযোগ্য প্রধান উত্স হইতে পারে ছাদবাগান। একটি পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, ঢাকা শহরের ৬০ ভাগ জায়গা দখল করিয়া আছে ফাঁকা ছাদ। রাজউকের হিসাবমতে, ছোট-বড় মিলাইয়া প্রায় ৪০ লক্ষ বিল্ডিং রহিয়াছে। সকল বিল্ডিংয়ের ছাদের আয়তন প্রায় ৮০ বর্গমাইল হইতে পারে। ঢাকা বায়ুদূষণে বিশ্বে উল্লেখযোগ্য শীর্ষস্থানীয় দেশ। সেই দিক হইতেও ঢাকার বায়ুকে সহজে দূষণমুক্ত করিবার অন্যতম ভালো উপায় ছাদবাগান। ইতিমধ্যে আমরা দেখিয়াছি, ছাদে লন করিয়া বা টবের ভিতরে অনেকেই বাগান করিতেছেন। আবার ঘরে জানালার পাশে ‘উইন্ডো বাগান’ও করিতেছেন অনেকে। ব্যালকনিতে ঝোলানো পাত্রে বা কাচের পাত্রের বাগানও দেখা যায়। অনেকেই টবে মাটির পরিবর্তে রঙিন পাথর কিংবা কোকোপিট (নারিকেলের ছোবড়া) দিয়া তাহাতে গাছ লাগাইতেছেন। ফাইবার গ্লাসের পাত্র, প্লাস্টিক বা কাঠের পাত্রেও এখন বহু মানুষ ঘরোয়া বাগান করিতেছেন। পাতিলেবু, কমলালেবু, পেঁপে, লাউ, কুমড়া, মরিচ, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, গুলঞ্চ শাক এমনকি তেজপাতাও হইতেছে অনেকের ছাদে। অর্থাত্ ছাদে বাগান করিবার বিষয়টি সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছে। নিঃসন্দেহে ইহা ভালো দিক।
যদিও ছাদে বাগান কোনো নূতন ধারণা নহে। খ্রিষ্টের জন্মেরও পূর্বে মেসোপটেমিয়া ও পারস্যের জুকুরাক নামীয় পিরামিড আকৃতির উঁচু পাথরের স্থাপনায় বাগান ও ছোট গাছ লাগানোর জন্য স্থান নির্ধারণ করিবার নিদর্শন পাওয়া যায়। এমনকি ধারণা করা হয়, ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানও বিভিন্ন ছাদ ও বারান্দার সমন্বয়ে তৈরি। তবে মনে রাখিতে হইবে, অজ্ঞতাবশত ইচ্ছামতো ছাদে বাগান করা উচিত নহে। একটি ছাদ কতখানি ভর বহন করিতে পারে, তাহা প্রকৌশল দ্বারা যাচাই করিয়া ছাদবাগান করা উচিত। অনেকেই পুরাতন ছাদেও ভারী ভারী গাছ লাগাইয়া থাকেন। ইহা বিপজ্জনক প্রবণতা। রোপণকৃত গাছের টব ছাদের বিম বা কলামে নিকটবর্তী স্থান বরাবর স্থাপন করা প্রয়োজন। ড্রাম অথবা টব স্থাপনের সময় খেয়াল রাখিতে হইবে যেন এইগুলি সরাসরি ছাদের উপরে বসানো না হয়। ইহাতে ছাদ স্যাঁতসেঁতে হইয়া যাইতে পারে। ছাদবাগানে গাছের গোড়ায় যেন পানি না জমে, সেই দিকে খেয়াল রাখিতে হইবে। কারণ, ছাদবাগানে ফুলের টব, ড্রাম বা অন্য পাত্রের জমা পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে।
অর্থাত্ ছাদবাগান একটি ভালো উদ্যোগ বটে, তবে চাষের জন্য কৃষিবিদ ও বাড়ির ছাদের স্বাস্থ্য বুঝিবার জন্য নির্মাণ প্রকৌশলের পরামর্শও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি এত সহজ নহে।
