মাস দেড়েক হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী ‘প্রণোদনার’ কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। আমার ধারণা ছিল, প্রণোদনা প্যাকেজের. অধীনস্থ ঋণ কার্যক্রম পুরোদমে চলছে। কিন্তু না, দৈনিক ইত্তেফাকের ৮ তারিখের রিপোর্ট পড়ে বোঝা গেল, ‘প্রণোদনা প্যাকেজের’ বাস্তবায়নের কাজ নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন। সংশ্লিষ্ট খবরটির শিরোনাম : ‘প্রণোদনা কেবল বড়দের গুরুত্ব, মাঝারি ও ছোটদের কী হবে? অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে উত্পাদক, ভোক্তা সবার হাতেই টাকা যেতে হবে’। রিপোর্ট পাঠ করলে বোঝা যায়, এর দুটো ভাগ :একটি হচ্ছে প্যাকেজ বাস্তবায়নের নানাবিধ সমস্যা এবং আরেকটি ভাগ হচ্ছে চাহিদা (ডিমান্ড) বিষয়ক। অর্থাত্ সরবরাহ (সাপ্লাই) ও চাহিদার সমন্বয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে শুধু উত্পাদকের কাছে টাকা গেলে হবে না, ভোক্তার হাতেও টাকা থাকতে হবে। নইলে উত্পাদিত পণ্য কে কিনবে? অতএব ভোক্তার হাতেও টাকা দিতে হবে। মধ্যবিত্ত ভোক্তা টাকা ছাড়ছে, অনেকেই রয়েছেন চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে। এছাড়া অনেক খাতই প্রণোদনার বাইরে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে ব্যাংকের ঋণ প্রভাবশালীরা পাচ্ছেন। ব্যাংকের পরিচালকরা যাদের কথা বলছেন তাদেরই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। শ্রমঘন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক তাদের নিরুত্সাহিত করছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছোট ছোট শিল্প-ব্যবসায়ের ওপর অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রেখেছেন। মোট প্রণোদনার পরিমাণ ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা আমাদের জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশ। ৭২-৭৩ হাজার কোটি টাকা শুধু শিল্পের জন্যই। এর মধ্যে আলাদাভাবে ছোট ও মাঝারিদের জন্য দেওয়া আছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বড় শিল্পের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা। আবার রপ্তানিকারক শিল্পের জন্য রয়েছে ‘এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ১২ হাজার ৭৫০ কোটি কাটা। ‘প্রাক-জাহাজিকরণ’ প্রি-শিপম্যান্ট) ঋণের জন্য আছে ৫ হাজার কোটি টাকা। পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাবদ আছে ৫ হাজার কোটি টাকা। সরকার এ ছাড়াও নানা সাহায্য-সহায়তা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। ডাক্তার-নার্সদের টাকা, বিনা মূল্যে চাল, ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ টাকা, দরিদ্রতম ১০০ উপজেলার সব দরিদ্রের ভাতার ব্যবস্থা, গৃহহীনদের ঋণ, পল্লী কর্ম সহায়ক সংস্থা (পিকেএসএফ) এবং আরো দুটো সংস্থাকে বরাদ্দ প্রদান, ৫ হাজার কোটি টাকার অধিকতর কৃষিঋণ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বেশি টাকা বরাদ্দ অবশ্য ব্যবসায়-শিল্প ও রপ্তানিকারদের জন্য। এদের জন্যই রয়েছে ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বাস করে সরকার এই বরাদ্দকৃত টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গাইডলাইন’ মোতাবেক বণ্টনের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দায়িত্ব দিয়েছে। তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এর জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনার টাকা বিতরণের জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে। মিটিং-সভা করছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। এতত্সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে ব্যাংকগুলো গড়িমসি তো করছেই, উপরন্তু বড় বড় গ্রাহককে নিয়েই ব্যস্ত। ছোট ও মাঝারিদের কোনো খবর নেই। এর কারণ হিসেবে ইত্তেফাকের রিপোর্টে প্রভাব এবং পরিচালকদের হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুটো ব্যাংকের পুরোনো সমস্যা, বরাবরের সমস্যা। এই সমস্যা ছাড়াও আরো সমস্যা আছে। প্রথমত বণ্টনের জন্য প্রাপ্ত টাকার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। দ্বিতীয়ত, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মধ্যে শিল্প ঋণ ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল অ্যাসেসমেন্ট করতে পারে, এমন অফিসারের সংখ্যা সীমিত। তারা মালিকদের এবং বড় বড় গ্রাহকের সেবাতেই ব্যস্ত হয়ে থাকেন। এবার অবশ্য আরেকটা সমস্যা যোগ হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। তারা ভুগছেন দুশ্চিন্তায়—কার চাকরি কখন যায়। কার বেতন কখন কমে। এছাড়া যারা প্রভাবশালী তারা এত প্রভাবশালী যে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ের অফিসারদেরকে পর্যন্ত গুলি করার সাহস রাখেন (এক্সিম ব্যাংকের ঘটনা) আর বড় বড় উদ্যোক্তার কাজ করে অল্প পরিশ্রমে ও মেধায় অনেক বেশি টাকা দেওয়া যায়। এতে কাজ কমে। অন্যদিকে সারা দেশে ছোট ও মাঝারি (এসএমই) শিল্প উদ্যোক্তা রয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ। করোনা ভাইরাস ১৯ দ্বারা এরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত, বলা যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বড় বড় উদ্যোক্তা-শিল্পপতিরা ব্যাংকের সুবিধা সব সময়ই বেশি পান। তাদের নানা জায়গায় টাকাপয়সাও আছে। এদের বাঁচার ব্যবস্থা অনেক। কিন্তু ছোট ও মাঝারি শিল্প ও ব্যবসার মালিকরা সব সময়ই সমস্যার মধ্যে থাকেন। সেজন্য এরা প্রায়শই মার খান। এদের মধ্যে ‘মর্টালিটি’ খুব বেশি। এদের জন্য রাখা হয়েছে কম টাকা। অথচ ‘জিডিপি’তে এদের অবদান ২৫ শতাংশ বলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেট-বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। কম টাকা রাখা সত্ত্বেও সেই টাকা ব্যাংকগুলো দিতে গড়িমসি করছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? লাখ লাখ ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচানোর উপায় কী? এরা মারা গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। অতএব খুবই কড়াকড়িভাবে এই টাকা বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক ‘কারিগরি’ জানে। তারা ভিন্ন খাতে টাকা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বলতে পারে—এসব ‘এসএমই’ ঋণ। আগেও তারা তা করেছে। অতএব এখানে দরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি। ‘অডিট’ শক্ত করতে হবে। বড়দের ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে; কিন্তু এতে সমস্যা অনেক বেশি। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ‘ওভার বরোড’ কোম্পানি। করোনা মহামারির আগেই তাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উত্পাদনক্ষমতার অর্ধেকের চেয়েও কম। এর মধ্যে সিমেন্ট, চিনি, ইস্পাত, বস্ত্র থেকে কোন শিল্প নেই—তা বলা কঠিন।
দ্বিতীয় ভাগের যে প্রশ্নটি ইত্তেফাকের রিপোর্টে আনা হয়েছে তা আলোচনা করতে হয় খুবই জরুরি ভিত্তিতে। আমি বহুদিন ধরেই ইত্তেফাকের মতোই মধ্যবিত্তের সমস্যার কথা লিখছি। লিখছি ‘কনজামশন’ (ভোগ)-এর দৃষ্টিকোণ থেকে, চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে। চাহিদা ছাড়া উত্পাদন করে লাভ কী? হ্যাঁ তৈরি পোশাকের চাহিদা বিদেশে; কিন্তু সেখানে এখন চাহিদাতে মন্দা শুরু হয়েছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারের দিকেই বেশি নজর দিতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাজারের পুরোধা হচ্ছে মধ্যবিত্ত। প্রায় ২৫ শতাংশ লোক এখন মধ্যবিত্ত, যার কথা ইত্তেফাকের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার কথা নিবন্ধের শুরুতে আমি বলেছি। ৫০ লাখ পরিবারকে পরিবারপিছু দুই হাজার ৫০০ টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে। পোশাককর্মীদের তিন মাসের বেতনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব প্রশংসনীয় কাজ; কিন্তু যারা বাজার সৃষ্টি করবে, বাজার ধরে রাখতে উন্নয়নকে টেকসই রাখবে, সেই জনগোষ্ঠী কিন্তু কিছু পায়নি। এই মধ্যবিত্ত বিপদে পড়লে কারো কাছে হাত পাততে পারে না। সে কিছু টাকা সঞ্চয় করত, সঞ্চয় করে মেয়াদি আমানত রাখত, সঞ্চয়পত্র কিনত। এর থেকে প্রাপ্ত সুদ দিয়ে অনেকেই সংসার চালাত, অনেকেই আয়ের পরিপূরক হিসেবে কাজে লাগাত। আজ সেই অবস্থা নেই। কি আমানত, কি সঞ্চয়পত্র—সব জায়গাতেই নিরুত্সাহিত তারা। তাদের আয় কমেছে। তাদের অনেকেই এখন নিম্নবিত্তে পরিণত হয়েছে। ইত্তেফাকের রিপোর্টে বলা হয়েছে—তাদের অনেকেই দৈনন্দিন খরচ বহন করার মতো ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এমতাবস্থায় করণীয় কী? সবার হাতে ‘ক্যাশ’ দরকার, মধ্যবিত্তকে বাঁচানো দরকার। সে যাতে টাকা না ছাড়ে তার ব্যবস্থা করা দরকার। ঢাকা শহর সারাদেশের যত ভোগ (কনজামশন) তার ৪০ শতাংশ এখানেই হয়। সারাদেশে যত ক্যাশ আছে, যত আমানত আছে, তার ৪০ শতাংশ এখানেই। এই শহরবাসী মধ্যবিত্তের প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। তার জন্য কী কী সুবিধা দেওয়া যায় তার কথা ভাবা দরকার। তারা কিন্তু রাস্তায় নামতে পারে না। তারা সংগঠিতও নয়। তাদের কথা বলার কোনো লোকও নেই। আশা করি, সরকারপ্রধান বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ
