অর্ধশত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী সাংবাদিক সুবিধা নিয়েছেন

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২০, ২২:৩০

করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার প্রতারণায় গ্রেফতার রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সিনিয়র সাংবাদিক মিলিয়ে অন্তত অর্ধশত ব্যক্তিকে তিনি বিভিন্ন সময়ে অর্থ দিয়েছেন। কিন্তু তার এই বিপদের সময় কেউ পাশে দাঁড়াননি। তার কাছ থেকে সুবিধা নেওয়া সবার মুখোশ উন্মোচনের কথাও বলেছেন তিনি। গ্রেফতারের পর ঢাকায় আনার সময় র্যাব এবং পরে রাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ এসব কথা বলেছেন। তদন্তকারীরা বলছেন, যাদের নাম আসছে, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

গতকাল বেলা ১১টার দিকে সাহেদকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার ও রিজেন্ট হাসপাতালের এমডি মাসুদ পারভেজের ১০ দিন এবং কর্মী তরিকুল ইসলামের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। আদালতের কাঠগড়ায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কেঁদে ফেলেন সাহেদ। এমনকি নিজে ও তার বাবা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথাও বলেন। এক মাস বাড়ি যেতে পারেননি, ছোট্ট সন্তানের মুখও দেখতে পারেননি এমন কথাও বলেন। অবশ্য উপস্থিত আইনজীবীরা তাকে থামিয়ে দেন।

মোহাম্মদ সাহেদকে কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত শুনানির পর তাদের তিন জনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। সাহেদের গায়ে ছিল নীল রঙের শার্ট আর শরীরে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। মাথায় হেলমেট, চোখে কালো চশমা। সাহেদ আদালতকে বলেন, ‘স্যার, যখন কেউ করোনার চিকিত্সা দিতে এগিয়ে আসেনি, তখন আমি, আমার হাসপাতাল এগিয়ে এসেছিল। সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছি। আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমার বাবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।’ আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বলেছে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে সাহেদ একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষণ্ড প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তাদের কাছে মানুষের জীবন-মৃত্যুর কোনো মূল্য নেই। সাহেদ তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিত্সা দেওয়ার নামে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সাহেদের প্রতারণার বিষয়টি জানার পর কোনো রোগী যদি প্রতিবাদ করত, তাদের তিনি বিভিন্নভাবে হুমকি দিতেন।

গত মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সাহেদ করোনার ভুয়া রিপোর্ট ও চিকিত্সায় প্রতারণার মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু আদালতকে বলেন, সাহেদ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। তার কোনো ক্ষমা নেই। সাহেদ হলেন দেশের শত্রু। শুনানির এক পর্যায়ে সাহেদ পানি খেতে চাইলে বিচারক পানি অন্য একজনকে আগে পান করে পরীক্ষার পর সাহেদের হাতে বোতল দিতে বলেন।

তবে সাহেদের আইনজীবীরা আদালতের কাছে দাবি করেন, সাহেদ ষড়যন্ত্রের শিকার। ৬ হাজার করোনার ভুয়া রিপোর্ট তৈরির অভিযোগ একেবারেই ভিত্তিহীন। কোনো ভুক্তভোগী এই মামলা করেননি। মামলায় সাহেদসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগও নেই। আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে রিমান্ডের আদেশ দেয়।

গত বুধবার সাহেদকে গ্রেফতারের পর হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনার সময় এবং বিকেলে ডিবিতে হস্তান্তরের পর জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, গত ১০ বছরে বহু মানুষের তিনি উপকার করেছেন। অনেক রাজনীতিবিদকে অর্থ দিয়েছেন। অনেক ব্যবসায়ীও তার কাছে এসেছেন। এমনকি বেশ কয়েক জন সিনিয়র সাংবাদিক নানা অছিলায় তার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন। পালিয়ে থাকার সময় তিনি দেখেছেন, ঐ সাংবাদিকেরাও তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি এখন তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে চান।

এদিকে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান স্কুল শেষ করেননি বলে আলোচনা থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নাম সংশোধন করে ‘সাহেদ করিম’ থেকে ‘মোহাম্মদ সাহেদ’ হওয়ার সময় তিনি ‘ও লেভেল’ সনদ দাখিল করেছিলেন নির্বাচন কমিশনের কাছে। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলছেন, সাহেদের ঐ শিক্ষাগত সনদের সত্যতা তারা খতিয়ে দেখবেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য দেওয়া তথ্যে সাহেদ নিজেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী বলে উল্লেখ করেছেন।

গত বুধবার সকালে ‘সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর সময়’ সাতক্ষীরা থেকে গ্রেফতার করা হয় সাহেদকে। এরপর হেলিকপ্টারে করে তাকে ঢাকায় আনা হয়।