নিউ ইয়র্কে ফাহিম হত্যা

নেপথ্যে ব্যবসায়িক বড় লেনদেন?

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২০, ২২:৩২

বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফাহিম সালেহ (৩৩)-এর হত্যাকারীকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। নিউ ইয়র্ক পুলিশের দাবি, হত্যাকারীকে তারা চিহ্নিত করতে পেরেছে। তবে স্মরণকালের নৃশংস এই হত্যার নেপথ্যে কী কারণ থাকতে পারে, সে ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাহিম সালেহ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বড় ধরনের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন থাকতে পারে।

প্রযুক্তিবিদ ফাহিম হত্যাকাণ্ড নিউ ইয়র্ক সিটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র, এমনকি বিশ্বপরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এই হত্যার খবর নিউ ইয়র্ক টাইমস, নিউ ইয়র্ক পোস্টসহ প্রায় সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ফলাও করে প্রচার করেছে। স্থানীয় সময় বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে লোয়ার ইস্ট ম্যানহাটনে নিজের বিলাসবহুল কনডোমিনিয়ামের (অ্যাপার্টমেন্ট) বাসা থেকে ফাহিম সালেহর মাথাবিহীন টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত বছর ২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলারে কেনা এই কনডোমিনিয়ামে একাই থাকতেন ফাহিম সালেহ।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরেনসিক রিপোর্ট থেকে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে নিহত ব্যক্তি ফাহিম সালেহ। পুলিশের ধারণা, ফাহিমকে আগে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে মরদেহ টুকরো করা হয়েছে, যাতে সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু ফাহিমের খোঁজে তার এক আত্মীয় অ্যাপার্টমেন্টের কল বেল দেওয়ায় খুনি মরদেহ রেখে পালিয়ে যায়। মরদেহ টুকরো করা ইলেকট্রিক করাতও ফেলে যায়, যেটি বৈদ্যুতিক আউটলেটে লাগানো ছিল।

এদিকে ফাহিম হত্যার পর তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা ওই ভবনের আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। গোয়েন্দারা স্থানীয় স্টোর, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন এবং সড়কের ট্রাফিক ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন। এসব ফুটেজে খুনিকে দেখা গেছে কি না সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, খুনিকে শনাক্ত করা গেছে। শিগিগর খুনি গ্রেপ্তার হবে। 

গোয়েন্দাদের বিশ্বাস, ফাহিম সালেহকে নিবৃত্ত করতে বৈদ্যুতিক স্ট্যানগান ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর তার দেহ থেকে মাথা, দুই হাত এবং হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সালেহর খোঁজে কেউ না গেলে খুনি তার লাশ সরিয়ে ফেলত। পুলিশ বলছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। খুনের পর রক্ত মুছে ফেলা হয়েছিল। ভবনের সিসিটিভির ফুটেজে খুনির পালিয়ে যাওয়ার কোনো দৃশ্য নেই। এ থেকে গোয়েন্দারা মনে করেন, খুনি অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের দরজা দিয়ে এবং ভবনের সিঁড়িতে গিয়ে পালিয়ে গেছে।

ফাহিম সালেহর অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিরাপত্তায় কোনো দারোয়ান ছিল না, তবে ‘বিশাল সুরক্ষা’ ছিল বলে দাবি করেছেন ভবন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। সেই ‘বিশাল সুরক্ষা’ ভেদ করে একজন খুনি কীভাবে ভবনে প্রবেশ করল পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।

এদিকে ফাহিম হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতায় লোয়ার ইস্ট ম্যানহাটনের বাসিন্দারা স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। এলাকার অনেকেই বলেছেন, এলাকাটি বসবাসের জন্য খুবই সুন্দর ছিল। এমন একটি সুন্দর ও অভিজাত এলাকায় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাদের হূদয় ভেঙে গেছে।

ফাহিম সালেহর পরিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। বৃহস্পতিবার পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিবার, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বা ফাহিমের বন্ধুর সঙ্গেও যোগাযোগ না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। পারিবারিক ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফাহিমের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আসা সংবাদ শিরোনাম এখনো আমাদের অনুধাবনের বাইরে। ফাহিম সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে, তিনি তার চেয়েও বেশি ছিলেন। ফাহিমকে মেধাবী এবং সৃষ্টিশীল উল্লেখ করে পারিবারিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফাহিম খুব অল্প বয়সেই সাফল্য পেয়েছিলেন এবং অন্যের মঙ্গলের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি যা-ই করুন না কেন, বৃহত্তর ভালো এবং তার পরিবারের কথা ভেবে তিনি তা করতেন।

ফাহিম সালেহর প্রতিষ্ঠিত নাইজেরিয়ার ডেলিভারি বাইক সার্ভিস ‘গোকাডা’ এক বিবৃতিতে বলেছে, আমাদের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম সালেহ এই সপ্তাহের শুরুতে নিউ ইয়র্কে মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে মারা গেছেন শুনে আমরা হতবাক ও দুঃখ পেয়েছি।