বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পানির চাপে সৃষ্ট বন্যায় অনেক স্থানে বাড়িঘর এখনো তলিয়ে আছে। এতে আশ্রয়হীন হয়ে পড়া হাজারো মানুষের কষ্ট বেড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, গুচ্ছগ্রাম, উঁচু জায়গায় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার পরিবার।
বানভাসি এসব মানুষ খাদ্যসামগ্রী ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত শৌচাগারের সুবিধা না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নওগাঁ ও গাইবান্ধায় অনেকগুলো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নওগাঁয় ইতিমধ্যে বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গতকাল ইত্তেফাকের ব্যুরো অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর—
কুড়িগ্রাম : ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে এখনো প্রবাহিত হচ্ছে। আট উপজেলার ৪৫ ইউনিয়নের প্রায় ৪০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে আছে। পানিবন্দি আড়াই লাখের বেশি মানুষ। বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে নদনদীর পানি ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে।
গতকাল কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম ব্রিজ পয়েন্টে বিপত্সীমার ৭৭ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ৯৪ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে বিপত্সীমার ১০১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। নাগেশ্বরীতে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হলেও দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় বেড়েছে দুর্ভোগ।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও একাধিক সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে। ফুলছড়ি উপজেলার ভাষারপাড়া ও মাঝিপাড়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং গাইবান্ধা সদর উপজেলার দক্ষিণ ঘাগোয়া ও কিশামত বালুয়া এলাকায় ঘাঘট নদীর বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। ভাষারপাড়া এলাকায় বাঁধে ছিদ্র হওয়ায় যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে।
গাইবান্ধা-সাঘাটা সড়কে উল্যা ভরতখালী এলাকায় বিভিন্ন স্থানে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সড়কের ১০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার ২৬টি ইউনিয়নের ৬০টি গ্রামের ১ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
নওগাঁ : মান্দার জোতবাজার পয়েন্টে বিপত্সীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আত্রাই ও রানি (ফকির্ণি) নদীর উভয় তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ৫০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে এ দুই নদীর উভয় তীরের সাতটি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ সহস্রাধিক মানুষ। আত্রাই উপজেলায় তিন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
আত্রাইর পানি বিপত্সীমার প্রায় ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আত্রাই উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উপজেলার জাত এলাকা ও বান্ধাইখাড়া নামক বাঁধ ভেঙে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ টিকিয়ে রাখতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে দিনরাত কাজ করছেন স্থানীয়রা। বাঁধে রাতে বসানো হয়েছে পাহারা। আত্রাইর জোতবাজার পয়েন্টে বিপত্সীমার ১২৫ সেন্টিমিটার ও আত্রাইয়ে প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। মান্দা ও আত্রাইয়ে প্রায় ২ হাজার পরিবারের মধ্যে গতকাল খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে।
জামালপুর : জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। জেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। বানভাসি মানুষ খাদ্যসামগ্রী ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে।
বগুড়া : বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি গতকাল ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ১২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। পানিবন্দি ৩ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ। যমুনায় প্রবল স্রোতের সঙ্গে ভাঙছে চরের পর চর। পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর চরাঞ্চলের মানুষ। উপজেলায় ১ লাখ ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তলিয়ে গেছে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমির ফসল।
সিরাজগঞ্জ : যমুনার পানি ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ৮৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কাজীপুরে ২৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ১১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হয়। বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী, কাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
পাবনা : পাবনায় নগরবাড়ীর মথুরা পয়েন্টে যমুনার পানি বিপত্সীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে। নদীপাড়ের ক্ষতিগ্রস্তরা এখনো কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাননি।
সিলেট : ঢল নামলেই বন্যাকবলিত সিলেটে পানি আরো বাড়ে। না হলে পানি কিছুটা কমে। দিনে কমলে রাতে বাড়ে। সুরমায় কমলে কুশিয়ারায় বাড়ে। গত দুই দিন থেকে পানি ওঠা-নামার এই খেলা চলছে। সব মিলিয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত।
ইত্তেফাক/জেডএইচ
