মনীষী

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২০, ২০:৩৬

নেলসন ম্যান্ডেলা

খন রঞ্জন রায়

 

পূর্বপুরুষদের কেউ স্কুলের চৌকাঠ মাড়ায়নি। উপজাতীয় গোলপাতার কুঁড়েঘরে কাঁচা গোবরে লেপা মাটির মেঝেতে যাঁর জন্ম। সেই নেলসন ম্যান্ডেলা এখন পৃথিবীর বিস্ময়। এক গহীন উপত্যকায় শৈশব কাটিয়েছেন তিনি। রাস্তাঘাট বলতে যা বোঝায় এমন কিছুই সেখানে ছিল না। কিশোর বয়স থেকে তাঁর সংগ্রামী জীবনের শুরু। দীর্ঘ ২৭ বছর একটানা দুর্গম নিঃসঙ্গ রবেনদ্বীপের কারা প্রকোষ্ঠে জীবন কাটাতে হয়েছে তাঁকে।

ভয়ঙ্কর সুন্দর পরিবেশে কেটেছে তাঁর শৈশব। আদিবাসী পোশাক পরে ছুটে গেছেন ছড়ায়, ঝরনার শীতল জলে সাঁতার কাটতে। প্রকৃতি জীবনবোধ শিখিয়েছে তাঁকে। বুনো ঘোড়ার পিঠে চড়ে তাকে বশ মানিয়েছেন। গাভীর ওলানে মুখ দিয়ে উষ্ণ দুধের পীযুষধারা পান করেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলার লেখা ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ আত্মজীবনীতে নিঃসংকোচে তুলে ধরেছেন নিজেকে। জন্ম সাল ১৯১৮। ১৮ জুলাই। বিশ্বব্যাপী এখন করোনাকাল চলছে, সে সময়ে ছিল ইনফ্লুয়েনঞ্জা মহামারি। ১৯২০ সালের শেষ প্রান্তে সেটা নিয়ন্ত্রণে আসে। সে বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের মানবেতর দুর্বিষহ জীবন, শেতাঙ্গদের নিপীড়ন সম্পর্কে জানা যাবে তাঁর গ্রন্থ পাঠে। তত্কালীন রাজনীতি, সহিংসতা, গেরিলা যুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, পারিবারিক জীবনব্যবস্থা, জেলজীবনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা চমত্কারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এতে।

১৯৯৩ সালে শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্তি ম্যান্ডেলার জীবনবৈশিষ্ট্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের অবিসংবাদিত নেতা, বিরল ব্যক্তিত্ব। বর্ণবাদের যে কালো থাবা আফ্রিকা অঞ্চলে পড়েছিল, তার চূড়ান্ত অবসান করে গেছেন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত তিনিই ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট। শুধু তাই নয়—দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপ্রধানও তিনি। বর্ণবাদবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের সফল পরিণতি ঘটিয়েছেন এই কালো মানিক।

কেবল দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, পুরো আফ্রিকান জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের আদর্শের ধারক, উপনিবেশবাদবিরোধী জাতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমের সক্রিয় সফল জননেতা। গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতীক ম্যান্ডেলাকে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদ্লে দ্লিত করা হয়েছিল। কারাগার থেকে আফ্রিকার মুক্তি ও বর্ণবাদ নিপাতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বঞ্চিত নিপীড়িত জনগণকে সংগঠিত করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন। আফ্রিকাজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী গৃহযুদ্ধের আতঙ্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে ভেবে ২৭ বছরের কারাজীবন থেকে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেয় তাঁকে তত্কালীন শ্বেতাঙ্গ সরকার। শুরু হয় শান্তি প্রতিষ্ঠার নবতর প্রচেষ্টা। সফলও হন তিনি। সর্বমহলে প্রসংশিত হন। ১৯৯৯ সালে স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপ্রধানের পদ ছেড়ে দেওয়া এই ‘মাদিবা’ অর্থাত্ জাতির জনক জীবদ্দশায় নোবেল ছাড়াও ২৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

নেলসন ম্যান্ডেলা জনহিতকর কাজ ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার জন্য ৬৭ বছর সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছেন। ‘আপনি অন্তত ৬৭ মিনিট এই সংগ্রাম ও আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করুন, মনোনিবেশ ঘটান’—এই আহ্বানকে সামনে রেখে জাতিসংঘ ১৮ জুলাইকে আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেলা দিবস ঘোষণা করে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিবস পালনকে আইন হিসাবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়। সেই থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে আলোচনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, শোভাযাত্রা, রক্তদান, সংগীত প্রভৃতি কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে আসছে। পৃথিবী বদলে দেওয়া বিশ্বপ্রেমিক এই অসাধারণ নেতার জন্মদিনটি বাংলাদেশেও বেশ আবেগ-উচ্ছ্তাসের সঙ্গে পালন করা হয়।