বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই উত্সবপ্রিয়। পালা-পার্বণ, ধর্মীয় উত্সব অন্তঃপ্রাণ এই জাতি। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় কর্মস্থল হইতে ঘরে ফিরিবার ধুম পড়িয়া যায়। প্রতি বত্সরই ঈদ সামনে রাখিয়া মানুষের যাতায়াত সুগম করিতে বিশেষ ট্রেন, বাস ও লঞ্চের ব্যবস্থা করিতে হয়। এমনকি বিমান কোম্পানিগুলি ঘরমুখী মানুষের জন্য বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থাও করিয়া থাকে। তাহার উপর বাংলাদেশের মানুষের কাছে ঈদুল আজহার একটি বিশেষ তাত্পর্য রহিয়াছে। এই ঈদকে সামনে রাখিয়া অধিক মানুষ পিতা-মাতা ও প্রতিবেশীদের নিকট ফিরিতে উদ্গ্রীব হইয়া থাকে। জন্মভূমিতে গিয়া প্রত্যেকে সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানিতে অংশগ্রহণ করে। চিরচেনা মানুষের সঙ্গে নামাজ আদায় ও প্রতিবেশী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাংস বিতরণ করা এই ঈদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইহাতে তাহারা ভিন্ন এক আত্মতৃপ্তি লাভ করিয়া থাকে।
কিন্তু এই বত্সর এমন এক বিশেষ পরিস্থিতির সম্মুখীন হইয়াছে দেশ, যাহা ছিল কল্পনাতীত। যেই সরকার মানুষকে উত্সাহিত করিয়া থাকে ঈদে ঘরে যাইবার জন্য, ঈদ উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হইয়া থাকে, সেই সরকারই বাধ্য হইয়া বলিয়া দিয়াছে—সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করিতে হইবে। অর্থাত্ বাড়ি ফিরা চলিবে না। মানুষের মধ্যেও বাড়ি ফিরার প্রবণতা নাই। ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, আসন্ন ঈদে বাসের আগাম টিকিটের চাহিদা নাই। অথচ প্রতি বত্সরই ঘরে ফিরা মানুষের তুলনায় পরিবহনে আসনসংখ্যা কম থাকায় টিকিট লইয়া বিড়ম্বনা সৃষ্টি হইয়া থাকে। আরো একটি বিষয় যুক্ত হইয়াছে। বহু মানুষ চাকরি হারাইয়াছে, বহুজনের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়াছে। যাহার ফলে বাড়ি ফিরিয়া আনন্দে ঈদ উদ্যাপনের সামর্থ্যও হারাইয়াছে অনেকে। এই সকল কারণে কোরবানির পশু বিক্রয়ের পরিমাণও চোখে পড়িবার মতো হারে কমিয়া গিয়াছে। ঈদ উত্সবের যে কয়েক দিন বাকি আছে, এই সময়ের কোরবানির পশু বিক্রয়ে বিশেষ পরিবর্তন আসিবে না বলিয়া কোরবানির পশু বিক্রয়-সংশ্লিষ্টরা জানাইয়াছেন।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, এই বিশেষ পরিস্থিতি আমাদের সম্মুখে আনিয়াছে চীনের উহানে উত্পত্তি হওয়া করোনা নামক এক ভয়াবহ ভাইরাস, যাহা ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সকল মানুষকে নাস্তানাবুদ করিতেছে। ছয় মাস পার হইয়া গেলেও এই ভাইরাসের প্রকোপ বাড়িতেছে বই কমিতেছে না। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইতেছে বিশ্বের ছোট-বড় সকল দেশকেই। কত দিন ইহা মানবজাতির ঘাড়ের উপর চাপিয়া থাকিবে তাহা এখন পর্যন্ত কেহ ধারণা করিতে পারিতেছে না। আশা করিতে দোষ নাই। আমরা আশা করিব, এই বিপত্তি কাটিয়া যাইবে এবং আসন্ন ঈদে মানুষ বিষণ্ন থাকিলেও পরবর্তী ধর্মীয় উত্সবে বিপুল উদ্দীপনায় সমগ্র দেশের মানুষ অংশগ্রহণ করিতে পারিবে। তাই জনমানুষের প্রতি আমাদেরও অনুরোধ থাকিবে, সরকারের নির্দেশনা পালন করিয়া করোনা ভাইরাসের প্রকোপ হইতে নিজেকে এবং অপরকে মুক্ত রাখিতে চেষ্টা করিবে।
