করোনা আমাদের যে শিক্ষা দিল

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২০, ২১:৩৮

আলোকপাত

আবুল কাসেম ভূঁইয়া

মানুষ আগের তুলনায় অনেক সংযত হয়েছে। আগে মানুষ নিয়ন্ত্রণহীন ছিল। মানুষের মনে যা চাইত তাই করত। কিন্তু এখন মানুষ নিজেকে অনেক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে এসেছে। করোনা মানুষকে মিতব্যয়ী হতে শিখিয়েছে। কারণ আগে মানুষ বেহিসেবীর মতো চলত। এক টাকার জায়গায় ১০ টাকা খরচ করত। করোনার কারণে আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় মানুষ হিসাব করে চলতে শিখেছে। আগে সামাজিক অনুষ্ঠান বিয়ে-শাদি, মেজবানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হতো। এখন তা বন্ধ রয়েছে। এতে লাখ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের এবং দেশের মানুষের মঙ্গল হবে। দেশে করোনা আসার পর মানুষের মাঝে অপরাধপ্রবণতা অনেক কমে গেছে। আগে মানুষ যে কোনো অপরাধ করতে দ্বিধা করত না, কিন্তু এখন মানুষ তার মনুষত্ব জ্ঞানের কারণে অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকছে। মানুষের মাঝে এই প্রবণতা শুভ লক্ষণ বলা যায়। আশা করি এই প্রবণতা যেন অব্যাহত থাকে।

করোনা দেশের মানুষের মাঝে মানবতাবোধ জাগ্রত করে দিয়েছে। দেশের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দুস্থ, অসহায়, গরিব মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়ে দেশের অধিকাংশ মানুষ। অন্নহীন মানুষের মাঝে খাবার এবং খাবারজাত পণ্য অবাধে বিতরণ করা হয়েছে। যে কারণে দেশের মানুষকে খাদ্যাভাবের মধ্যে পড়তে হয়নি। দেশের মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ, সংগঠনসহ বিভিন্ন সংস্থা যেভাবে দুস্থ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। দেশের করোনা চিকিত্সা নিয়ে যেখানে দুর্ভোগের অন্ত নেই, সেখানে কিছু বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান করোনা চিকিত্সার জন্য এগিয়ে এসেছেন। তারা তাদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অথবা প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহযোগিতা, ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদান করেছেন। শুধু তাই নয়, অনেকেই করোনা রোগীদের জন্য আইসোলেশন সেন্টার, চিকিত্সাকেন্দ্র চালু করেছেন। দেশের মানুষের এই মানবিকতাবোধ সবার মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশের এই মানবতাবোধ যেন চিরজাগ্রত থাকে— এটাই সবার কাম্য। করোনা ভাইরাস যেখানে পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, সেসব দেশের অবকাঠামো পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে। যেখানে সেসব দেশের অধিকাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন সেখানে আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে করোনাকে মোকাবিলা করে চলেছে। যেখানে আমাদের দেশে করোনা চিকিত্সার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দেশের অধিকাংশ মানুষ ঘরে বসে সাহসিকতার সঙ্গে করোনার চিকিত্সা করে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। দেশের মানুষের মাঝে যদি এই সাহসিকতার ভাব না থাকত তাহলে অনেকেই করোনা আতঙ্কে মারাই যেতেন। বাঙালি সাহসী জাতি। করোনাকে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করে চলেছে। যা নাকি সারা বিশ্বে আলোচিত হয়েছে।

করোনার কারণে জানা গেছে দেশের চিকিত্সা সেবার বাস্তব চিত্র। চিকিত্সা সেবা নিয়ে দেশে যে ব্যবসা চলে আসছে, তার প্রকট চিত্র এবারে দেখা গেছে। কতিপয় অসাধু ব্যক্তির কাছে পুরো চিকিত্সাব্যবস্থা যে জিম্মি হয়ে আছে, তা জানতে পারলাম। দেশের প্রাইভেট চিকিত্সকরা চেম্বার বন্ধ করে দেওয়ায় রোগীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অপর দিকে দেশের বেশ কিছু সাহসী চিকিত্সক করোনা রোগীদের চিকিত্সা সেবা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, তারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ পর্যন্ত করেছেন। অনেকেই করোনাকে জয় করে পুনরায় চিকিত্সা সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন। এসব সাহসী যোদ্ধাদের জাতি চিরদিন স্মরণ করবে। দেশের পুলিশ বাহিনীর ব্যাপারে মানুষের বিরূপ ধারণা ছিল। কিন্তু করোনাকালীন দেশের অধিকাংশ পুলিশ যে মানবিক সেবা দিয়েছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। যা নাকি পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পালটে দিয়েছে। পুলিশ বাহিনী যে সুনাম অর্জন করেছে, তা রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব। দেশে করোনা আসার পর দেশের মানুষের মাঝে যেসব পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো যদি তারা ধারণ করে রাখে, তবেই মুক্তি মিলবে। করোনার শিক্ষা পুরো জাতির জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাক—এটাই প্রত্যাশা।

n লেখক :বিমা কর্মকর্তা