কৃষিশিক্ষার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২০, ২১:৩৯

মো. মাসুদ রানা

 

কৃষিই কৃষ্টি। কৃষিকাজ শুরুর ইতিহাস প্রাচীন। মানব সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা চিরসবুজ বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের সুপ্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষির সুনিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ পরিক্রমায় কৃষি বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্যের কারণে দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিশিক্ষা ও গবেষণাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্বনামধন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ ও মেধাবী কৃষিবিদরা দেশের কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ঘাটতি নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিশিক্ষার অন্যতম বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অনুষদে ১৬টি বিভাগের অধীনে ফসলের উত্পাদন, চাষ পদ্ধতি, রোগ বালাই নির্ণয় ও প্রতিরোধ, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা দিয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে কৃষিখাতে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষিশিক্ষার আধুনিকায়ন ও গুণগত মানোন্নয়ন অতীব জরুরি। আর এজন্য তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তবমুখী প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগের তত্ত্বাবধানে সপ্তাহব্যাপী সম্প্রসারণ মাঠ সফরের আয়োজন করা হয়ে থাকে। সম্প্রসারণ মাঠ সফরের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে স্থানীয় সরকারের অন্যতম স্তর উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান এবং উপজেলা পর্যায়ে কৃষি, মত্স্য, প্রাণি সম্পদ ও অন্যান্য জাতিগঠনমূলক দপ্তরের উদ্দেশ্য, সাংগঠনিক রূপরেখা ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভাবিত নিত্য নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কার্যক্রম ও কৃষক পর্যায়ে সামনাসামনি সমস্যাগুলো সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জ্ঞান দেওয়া হয়ে থাকে।

ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ ও পরিপূর্ণ কৃষিবিদ তৈরিতে প্রায়োগিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ জ্ঞান অর্জনের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এজন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃষিশিক্ষার সিলেবাস যুগোপযোগীকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা জরুরি। উচ্চশিক্ষায় পুস্তক নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তবধর্মী ও হাতে-কলমে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়ে জ্ঞান ও অনুসন্ধিত্সুমূলক প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞানকে পরিপূর্ণ করতে এবং তাদের যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে ইন্টার্নশিপ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এ পর্যন্ত কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাস্তবমুখী ও প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। যার ফলে কর্মক্ষেত্রে তাদেরকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাই কৃষিশিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে এবং কৃষি অনুষদের গ্রাজুয়েটদের গুণগত মানোন্নয়নে ইন্টার্নশিপ প্রবর্তন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, কৃষি আমাদের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সার্বিক উন্নয়নে হাতে-কলমে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে কৃষি শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার মাধ্যমে কৃষিবিদদের গুণগত মানোন্নয়ন এবং আগামী দিনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি। সর্বোপরি দল, মত নির্বিশেষে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এই প্রত্যাশা করি।

প্রভাষক, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ,

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ