সাধন সরকার
বর্ষা মানেই যেন জলাবদ্ধতা! এ যেন এক অমোঘ নিয়তি! বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয় রাজধানীবাসীকে। এক সময় এই ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খাল-নালা দিয়ে আশপাশের নদীতে চলে যেত। ৫০টিরও বেশি খাল বৃষ্টির পানি ধরে রাখত। কিন্তু খাল-নালাগুলো দখল-ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনে ভাটা পড়েছে। যে কোনো শহরের মোট ভূমির কমপক্ষে ১২ ভাগ জলাধার থাকা দরকার। ঢাকায় আছে মাত্র ২ ভাগ। ফলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জায়গা নেই। আবার ৮০-৯০ ভাগ জায়গা কংক্রিটে ঢাকা। এতে মাটির নিচে পানি যেতে পারে না। ঢাকার নিম্নাঞ্চল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই সমস্যা আরো প্রকট হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক জলাধার ও নিম্নাঞ্চলগুলো ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।
বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের সমন্বয়হীনতায় নগরবাসীকে ঝামেলা পোহাতে হয়। আবর্জনা আর দখলের কারণে অধিকাংশ প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। আশপাশের নদ-নদীর সঙ্গে সংযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। অথচ বৃষ্টির পানি সরাতে খাল-জলাশয়ের সঙ্গে আশপাশে নদ-নদীর সংযোগ থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে শহরের ময়লা-আবর্জনা সাফ হয়ে যায়। দূষণে কালো হয়ে যাওয়া নদ-নদীগুলো প্রাণ ফিরে পায়। ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনসহ ৬টি সংস্থা এবং বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করে থাকে। তারপরও জলাবদ্ধতা কমছে না কেন? এর কারণ ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য উন্নয়ন কাজে দেশি-বিদেশি সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। রাজধানীর বৃষ্টির পানি সিংহভাগ নিষ্কাশিত হয় ওয়াসার তত্ত্বাবধানে থাকা ২৬টি খাল ও বড় নালা দিয়ে। কিন্তু দুই সিটি করপোরেশনের অভিযোগ— ওয়াসা খাল-নালা ঠিকমতো পরিষ্কার করেন না! আবার ওয়াসা থেকে বলতে শোনা যায়, সিটি করপোরেশন ঠিকভাবে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ না করায় নালা ও খাল আবর্জনায় ভরা থাকে।
যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার ছোঁয়া থাকলে ঢাকার খালগুলো হতে পারত সৌন্দর্য ও বিনোদনের এক একটি কেন্দ্র। এই খাল-নালাগুলো উদ্ধার করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে মশার যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেত নগরবাসী। মনে রাখা দরকার, ঢাকা শহর ও এর আশপাশের নদী, খাল-নালাসহ সমস্ত জলাশয় ভালো না রাখলে ঢাকাবাসীও ভালো থাকবে না। জলাবদ্ধতার জন্য পলিথিন-প্লাস্টিকও কম দায়ী নয়। নালা ও ড্রেনগুলো প্লাস্টিক-পলিথিন মুক্ত রাখতে হবে। যথাসময়ে প্রকল্প শেষ করার পাশাপাশি প্লাস্টিক-পলিথিনের বর্জ্য পরিষ্কার করতে পারলে জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছুটা হলে কাজ দেবে। দেশের ছোট-বড় সব শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশন কিংবা পৌর কর্তৃপক্ষের। ফলে অন্যান্য শহরে রাজধানীর থেকে তুলনামূলক জলাবদ্ধতা কম হয়। ঢাকা শহরেও জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব সর্বোচ্চ দুই কর্তৃপক্ষের কাছে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তাহলে কাজের সমন্বয় করতে সুবিধা হবে। তবে আশার কথা, এখন ঢাকা শহরের ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে, নগরবাসীও সচেতন হচ্ছেন। মোটকথা খাল ও সব ধরনের প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগী হতে হবে। ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বাড়াতে হবে বিভিন্ন সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের কাজের সমন্বয় ও আন্তরিকতা।
ঢাকা
