শহরে সবুজের সান্নিধ্য

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২০, ২২:৪৮

ছাদবাগান

আসিফুর রহমান সাগর

বাগান মানেই তো ফুলে-ফলে ভরা কোনো বিশাল উদ্যান নয়। গ্রাম-বাংলায় বাগান মানে ফলের গাছ আর বাড়ির উঠানে দেশি ফুলের বাহারি বাগান। শহুরে জীবনে তো আর তা সম্ভব নয়। শহুরে বাগান মানে গৃহকোণে প্রকৃতিকে ভালোবাসার ছোট্ট নিদর্শন ধরে রাখা। তবে এখন শহুরে বাগানের ধারণাও পালটে গেছে। মানুষ ঘরের লাগোয়া ছোট্ট বারান্দার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে ছাদেই গড়ে তুলছে বিশাল বাগান।

এই করোনাকালে ছাদবাগানের প্রতি মানুষের আগ্রহ আরো বেড়েছে। কারণ, স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাগানে কাজ করলে বা সবুজ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মানসিক চাপ কমে। আজকের এই যান্ত্রিক জীবনে শরীর আর মনকে ফিট রাখতে প্রকৃতির কোনো বিকল্প নেই। ঘরের বাইরে যখন যাওয়া যাচ্ছে না তখন বাগানে কাজ করে সবাই নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইছেন।

ছাদবাগান—শহুরে কৃষি :আর বর্তমানে ছাদবাগান          বাংলাদেশের শহুরে কৃষি ব্যবস্থার শৌখিন পদযাত্রা সময়ের বিবর্তনে এক সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যদিও ছাদে বাগান কোনো নতুন ধারণা নয়। অতি প্রাচীন সভ্যতাতেও ছাদে বাগানের ইতিহাস রয়েছে। খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে মেসোপটেমিয়া ও পারস্যের জুকুরাক নামীয় পিরামিড আকৃতির উঁচু পাথরের স্থাপনায় বাগান ও ছোট গাছ লাগানোর জন্য স্থান নির্ধারণ করার নিদর্শন পাওয়া যায়।

বিশ্বব্যাপী নগরায়ণ বাড়ছে। ফলে শহুরে কৃষি নামক এক নতুন শব্দ আমাদের শব্দ ভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছে। এ কৃষির শুরুটা শৌখিন। ব্যাপক বাণিজ্যিক উত্পাদন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের দেশে দেশে এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। শহরাঞ্চলে ফুল, ফল ও সবজির পারিবারিক বাগান এখন আর কেবলই শৌখিনতা বা পারিবারিক প্রয়োজন নয়। পরিবেশ রক্ষা আর নগরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে অনেক দেশেই বাড়ির ছাদ, বারান্দা, গাড়ি-বারান্দা, ফুটপাত, পার্ক, সরকারি খাস ভূমি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কৃষি উত্পাদন বিশেষ করে উদ্যান ফসল ও বাহারি ফুলগাছের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে সবুজ নগর। আমাদের দেশেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে ছাদবাগানের মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে শহরে সবুজায়ন শুরু হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয় বরং একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এদেশে ছাদবাগানের সূচনা।

খিলগাঁও সি ব্লকের বাসিন্দা আয়শা খানম তার চার তলা বাড়ির ছাদেই গড়ে তুলেছেন বিশাল ছাদবাগান। তার ছাদেই ফলেছে আম, পেয়ারা, ডালিম, লেবুসহ নানা ফল ও ফুল। তিনি নিজেই যত্ন করেন গাছের। আয়শা খানম জানালেন, যখন বাড়ি এক তলা ছিল তখন বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় অনেক গাছ ছিল। বাড়ি করতে গিয়ে সেসব গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে। তাই ছাদেই এখন বাগান করি। অবসর জীবনে এই ছাদবাগান আমার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। আমার সময় কেটে যায় বাগানের দেখাশোনা করতে করতে।

এদিকে ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতেও ছাদ ফাঁকা না রেখে বাগান করতে উত্সাহিত করা হচ্ছে বাসিন্দাদের। সবাই মিলে ছাদের জায়গা ভাগ করে নিয়ে যার যার মতো গাছ লাগাচ্ছেন।

ছাদবাগান নগরের উষ্ণতা কমায়

ছাদবাগান স্থাপন করা হলে শহরের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত কমে আসে। আমাদের শহরগুলোতে খোলা জায়গা দিন দিন কমে আসছে। ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে কৃষিবিদ আবু কাউসার মো. সারোয়ার জানান, ইট-কাঠের ভবনের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাচে মোড়া বহুতল ভবন। বিশেষ করে জানালায় কাচ ও বাণিজ্যিক ভবনের টেকসই স্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে হালকা কিন্তু শক্তিশালী ধাতব পাত, ফাইবার ও গ্লাস। সূর্যের তাপ এবং আলো এ ধাতব ও কাচের কাঠামোর একটিতে পড়ে অপরটিতে প্রতিফলিত হয়। বারবার প্রতিফলনে ঐ স্থান ও এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় সামান্য বেড়ে যায় এবং শহর জুড়ে তৈরি হয় অসংখ্য হিট আইল্যান্ড বা তাপ দ্বীপ। ভবনে বা এর কাঠামোতে বাগান স্থাপন করা হলে বাগানের গাছ এ তাপ শুষে নেয়  এবং গাছের দেহ থেকে যে পানি জলীয় বাষ্প আকারে প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় বেরিয়ে যায় তা সেই স্থানের তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমিয়ে আনে। অসংখ্য ছাদবাগান বা গাছপালা এ প্রক্রিয়ায় শহরের উচ্চ তাপমাত্রাকে কমিয়ে আনে।

যেভাবে করবেন ছাদবাগান

বাড়ির মালিক বা ফ্ল্যাট মালিকরা নিজেদের ইচ্ছামতো ছাদবাগান সাজিয়ে তোলেন। তবে বাগান করার সময় কিছু কিছু দিক নজরে রাখতে হবে। অনেকেই টবে বা বড় বড় ড্রাম অথবা ট্রেতে গাছ লাগান। কেউ কেউ আবার ছাদে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করে তাতে গাছ রোপণ করেন। ছাদের আকার ও সহনশীলতার দিকে লক্ষ্য রেখে নানা কাঠামোর ওপর স্থাপন করেন টব, মাচা। তবে এলোমেলো ও অপরিকল্পিত ছাদবাগান ভবনের ক্ষতি করবে। ছাদ কতটুকু ওজন নিতে পারবে তারও সঠিক তথ্য জানতে হবে। প্রয়োজনে প্রকৌশলীর পরামর্শ নিতে হবে। কোনোভাবেই একে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এতে ছাদের এবং ভবনের ক্ষতি হবে।

ছাদে বাগান করার সময় প্রথমেই ছাদের আয়তন অনুসারে কাগজে-কলমে খসড়া ম্যাপ করে বিভিন্ন স্থাপনা ও ভবনের কলামগুলো চিহ্নিত করে নিতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ চাহিদা ও রুচি অনুসারে সাজানো না হলে এর পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত শ্রমসাধ্য একটি কাজ। বড় বা ভারী গাছগুলো ছাদের বিম বা কলামের নিকটবর্তী স্থান বরাবর স্থাপন করতে হবে। ছাদ যেন ড্যাম্প বা স্যাঁতসেঁতে হতে না পারে সেজন্য রিং বা ইটের ওপর ড্রাম অথবা টবগুলো স্থাপন করলে নিচ দিয়ে আলোবাতাস চলাচল করবে এবং ছাদও ড্যাম্প হবে না।

যেসব গাছ লাগাতে পারেন

আম-বারিআম-৩ (আম্রপালি), বাউআম-২ (সিন্দুরি); পেয়ারা-বারি পেয়ারা-২, ইপসা পেয়ারা-১; কুল-বাউকুল-১, ইপসা কুল-১ (আপেল কুল), থাইকুল-২ ; লেবু-বারি লেবু-২ ও ৩, বাউ কাগজি লেবু-১; আমড়া-বারি আমড়া-১, বাউ আমড়া-১; করমচা-থাই করমচা; ডালিম (দেশি উন্নত); কমলা ও মাল্টা-বারি কমলা-১, বারি মাল্টা ১; জামরুল-বাউ জামরুল-১ (নাশপাতি জামরুল), বাউ জামরুল-২ (আপেল জামরুল) এসব। সবজির মধ্যে লালশাক, পালংশাক, মূলাশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, লেটুস, বেগুন, টম্যাটো, মরিচ, লাউ, শিম প্রভৃতি। আর প্রায় সব ধরনের ফুলগাছ লাগানো যেতে পারে। তবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিদিন মাটির ও গাছের পরিচর্যা করতে হবে। পাখির হাত থেকে গাছের ফল বাঁচাতে নেট দিয়ে ঘিরে দিতে হবে। প্রয়োজনমতো পানি সেচ দিতে হবে আর কীটনাশকের প্রয়োগও করতে হয়।