নাহিয়ান আলম রাফি
কোয়ালিটি এবং কোয়ানটিটি দুটি ইংরেজি শব্দ। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোয়ানটিটি হয়তো বেড়েছে কিন্তু কোয়ালিটি আরো বাড়াতে হবে। আর কোয়ালিটি বাড়াতে হলে আমাদের একটা শব্দের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর সেটা হলো গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসমপন্ন গবেষণা বাড়াতে হবে। তাহলে আমরা কি করতে পারি? এর একটা সম্ভাব্য উত্তর হয়তো আমরা খুঁজে বের করতে পারব। চলুন খোঁজার চেষ্টা করি। আমাদের পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ পুরোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। Indian Institute of National Ranking-এর তথ্যমতে এটি ভারতের পঞ্চম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়। উইকিপিডিয়ার দেওয়া তথ্যমতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১২টি ক্যাম্পাস রয়েছে। এর মধ্যে মূল ক্যাম্পাসটি কলেজ স্ট্রিটে এবং অন্য ক্যাম্পাসগুলো রাজাবাজার, বালিগঞ্জ, আলিপুর, বিধাননগর, হাজরা এবং দক্ষিণ সিঁথিতে অবস্থিত। এবার আমরা কলকাতা থেকে একটু টোকিও ঘুরে আসি! জ্বি হ্যাঁ, বলছিলাম টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। প্রায় ১৪৩ বছরের পুরোনো এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি জাপানের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট পাঁচটি ক্যাম্পাস রয়েছে যার মধ্যে কোমাবা, হোংগো এবং কাশিউয়া ক্যাম্পাস উল্লেখযোগ্য। এখানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এজন্যেই আনলাম যেন আমরা তাদের পথকে অনুসরণ করতে পারি। উভয়ই খুবই পুরোনো এবং শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশেও এরকম বেশ কিছু পুরোনো এবং মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় আছে। যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে ভর্তিযুদ্ধে লিপ্ত হয়। মোটামুটি সবারই লক্ষ্য থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আমাদের দেশের বিপুল পরিমাণ এ শিক্ষার্থীর তুলনায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংখ্যা খুবই কম। একটা বড় সংখ্যার শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে থাকে। যেহেতু দেশের ছাত্রসমাজ এবং অভিভাবকদের পছন্দের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, তাই সরকার প্রায় প্রতিবছর বিভিন্ন জেলায় নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই কিন্তু শিক্ষার মান কতটুকু বজায় থাকছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। এক্ষেত্রে আমরা আগে উল্লেখিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখানো পথ অনুসরণ করতে পারি অর্থাত্ ক্যাম্পাস সংখ্যা বাড়াতে পারি। তাহলে শিক্ষার গুণগতমান কিছুটা হলেও বজায় থাকবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে। ফলে আরো বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যাম্পাস যদি আশুলিয়াতে অথবা কেরানীগঞ্জের দিকে স্থাপন করা হয় এবং যে শিক্ষক কেন্দ্রীয় ক্যাম্পাসে ক্লাস নিবেন, তিনি যদি অন্যান্য ক্যাম্পাসেও ক্লাস নেন, তাহলে সবাই একই মানের শিক্ষার সুযোগ পাবে। ফলে শিক্ষার গুণগতমান কিছুটা হলেও বজায় থাকবে বলে আমাদের বিশ্বাস। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা বেশি হলেও আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো পুথিগত বিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমাদের দেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। এছাড়া যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করেন, তারাও অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদেরকেও যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সর্বোপরি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইকে হাতে হাত রেখে দেশের গবেষণা খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। না হলে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থী গবেষণার জন্য দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন, তা আটকানো সম্ভব হবে না। যারা চলে যান, তাদের অনেকেই আর কখনো ফিরে আসেন না। তারা বিদেশে যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পান, সেই একই সুযোগ-সুবিধা যদি তাদের এদেশেই দেওয়া যায়, তাহলে দেশের মেধা দেশেই থাকবে এবং তাদের থেকে দেশ ও জাতি অনেক উপকৃত হবে। অর্থাত্ আমরা এই বিষয়টা বুঝতে পারলাম যে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান বাড়াতে হলে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে দূরত্ব কমাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর যে জার্নাল প্রকাশিত হয়, তা যেন বিশ্বমানের হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। উপরোক্ত বিষয়গুলোর ওপর যথাযথ দৃষ্টি প্রদান করলে, আমাদের বিশ্বাস বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একদিন বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থানে উঠে আসবে এবং প্রকৃত শিক্ষায় এগিয়ে যাবে আমাদের বাংলাদেশ।
n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
