স্বরূপকাঠিতে পেয়ারায় ফের ‘ছিটাপড়া’ রোগ

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২০, ২২:৩৭

প্রায় ২০০ বছর আগে স্বরূপকাঠিতে পেয়ারার চাষাবাদ শুরু হয়। কিন্তু গত ৭০-৭৫ বছর ধরে চলছে পেয়ারার বাণিজ্যিক আবাদ। বিগত দিনে পেয়ারায় অ্যানথ্রাকনোস নামক (স্থানীয় ভাষায় ছিটাপড়া বা ছিড়পড়া রোগ) রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও ২০০৭ সালে সিডরের পর থেকে প্রাকৃতিকভাবে ঐ রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যায়। কিন্তু এ বছর পেয়ারায় আবার দেখা দিয়েছে ছিটাপড়া রোগ। এতে চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ  দেখা গেছে।

এছাড়া এই এলাকায় উত্পাদিত পেয়ারা সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। পেয়ারা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে মৌসুমি এই ফল বছর জুড়ে ভোক্তাদের চাহিদা মেটাত। এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করা যেত। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি চাষিরাও আর্থিকভাবে লাভবান হতেন।

স্বরূপকাঠি জাতের পেয়ারা ‘বাংলার আপেল’ নামে খ্যাত। উত্পাদন খরচ বেশি এবং ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে লোকসানের মুখে স্বরূপকাঠির পেয়ারাচাষিরা। ইতিমধ্যে অনেক চাষি পেয়ারার চাষাবাদ বাদ দিয়ে আমড়া ও লেবু চাষ শুরু করেছেন। উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, ধলহার, কঠুরাকাঠি, আন্দাকুল, জিন্দাকাঠি, ব্রাহ্মণকাঠি, আতা, জামুয়া, মাদ্রা ঝালকাঠি, শশীদ, পূর্ব জলাবাড়ি, আদাবাড়ি, জৌসারসহ     ২৬ গ্রামে ৬৫৭ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষাবাদ হয়। আর পেয়ারার চাষাবাদ ও বিপণনব্যবস্থার সঙ্গে ঐ সমস্ত এলাকার ৬-৭ হাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। 

কুড়িয়ানার পেয়ারার ভাসমান হাটের চাষিরা জানান, পেয়ারা বাগান পরিচর্যায় শ্রম মজুরিসহ উত্পাদন ব্যয় বেশি। অন্যদিকে ফলন গতবারের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। এ বছর পেয়ারা আকারেও ছোট। উত্পাদন ব্যয় বেশি এবং ফলন কম হওয়ায় চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন।

পেয়ারাচাষি ইউপি সদস্য বাবুল মণ্ডল জানান, সরকারি বা বেসরকারি  উদ্যোগে বড় আকারের পেয়ারা প্রসেসিং করে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পেয়ারা ও আমড়াচাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহর মণ্ডল ইত্তেফাককে জানান, এ বছর পেয়ারায় ছিটাপড়া রোগ দেখা দিয়েছে। পেয়ারা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ থাকলে মৌসুমি এই ফল বছর জুড়ে ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে পারত। এ থেকে উত্পাদিত জ্যাম-জেলি দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতো। পেয়ারা সংরক্ষণে কোনো হিমাগার বা  জ্যাম-জেলি তৈরির কারখানা গড়ে ওঠেনি। উপজেলার কুড়িয়ানা, আটঘর, আদমকাঠি, ধলহার জিন্দাকাঠিসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই পেয়ারার ভাসমান হাট বসে। বর্তমানে পেয়ারা পাইকারিভাবে মণপ্রতি ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেয়ারার মৌসুমে ঢাকা, চাঁদপুর, কুমিল্ল­­া, সিলেট, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে  সরাসরি পেয়ারা কিনে নিয়ে যান। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও প্রতিদিন শত শত মণ পেয়ারা এখান থেকে লঞ্চ, ট্রলার ও ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান দেন। আটঘর কুড়িয়ানা ইউপি চেয়ারম্যান শেখর কুমার সিকদার বলেন, স্বরূপকাঠি-নবগ্রাম-বরিশাল সড়কের ঝালকাঠির নবগ্রাম অংশের সড়ক অপ্রসস্থ এবং কুড়িয়ানা-রায়েরহাট সড়কের কুড়িয়ানা আয়রন ব্রিজটি ঢালাই ব্রিজ না হওয়ায় এখানকার পেয়ারাসহ অন্যান্য উদপাদিত পণ্য পরিবহন  ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চপল কৃষ্ণনাথ বলেন, সংরক্ষণসহ কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। যুগ যুগ ধরে চাষিরা পেয়ারা চাষাবাদ করলেও উদ্যোক্তার অভাবে হিমাগারসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে না ওঠায় দিনে দিনে চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা।