ইত্তেফাক রিপোর্ট
প্রতারকদের ‘আইডল’ হিসেবে পরিচিত মো. সাহেদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। কখনো ক্ষমতার দাপট, কখনো অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ব্যবসা নিয়েছেন তিনি। এমনকি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামেও হাসপাতালে সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করার সুযোগ পান। সেই অনুমতিও দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই সুযোগে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নকল ও নিম্নমানের পিপিই-মাস্ক সরবরাহ করেন। তার এই প্রতারণার কারণে অনেক চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। হয়তো কাউকে মৃত্যুবরণও করতে হয়েছে। তবু এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন সাহেদ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাদের সঙ্গে সাহেদের সখ্য ছিল? কাদের নির্দেশে সাহেদের লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালে অত্যন্ত দামি যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়? এমনকি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামেও কীভাবে সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের সুযোগ পান? স্বাস্থ্য অধিপ্তরের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সাহেদ যে কাজগুলো পেয়েছেন, তার কোনোটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। ঐ সূত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ইঙ্গিত করে বলেছে, অধিদপ্তরে এলে সাহেদ অন্য কারো রুমে ঢুকতেন না। সোজা চলে যেতেন মহাপরিচালকের কক্ষে। এমনকি ঐ কক্ষে প্রবেশের জন্যও তাকে কোনো অনুমতি নিতে হতো না। অথচ সরকারি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এলেও মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। সাহেদ কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর অনেকেই এখনো মহাপরিচালকের এই পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে ১০ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। গতকাল শনিবার ছিল রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন। জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদের কাছ থেকে কী পাওয়া গেল—জানতে চাইলে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ‘সরকারকে নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করেছিলেন মো. সাহেদ। আলবার্ট গ্লোবাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু আলবার্ট গ্লোবাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামে আমরা কোনো প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাইনি। সাহেদও স্বীকার করেছেন, এই নামে তার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। শুধু ফেসবুকে একটা পেজ খুলে এই প্রতারণা শুরু করেছিলেন তিনি।’
গতকাল দুপুরে এক অনির্ধারিত ব্রিফিংয়ে আবদুল বাতেন বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের কথা বলে কাজ নিয়ে সাহেদ বিভিন্ন কারখানায় সাবকন্ট্রাক্টে মাস্ক ও পিপিই বানানোর কাজ দিতেন। সেখান থেকে তৈরি করা নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই করোনা সংক্রমণের প্রথম দিকে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সরবরাহ করেন।’ তিনি বলেন, পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে, এগুলো ছিল নকল।
আবদুল বাতেন বলেন, সাহেদের প্রতারণার নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্ত চলছে। আরো অনেকেই প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ নিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, ‘সাহেদ কীভাবে এত টাকাপয়সার মালিক হলেন আমরা তা খতিয়ে দেখছি। আমাদের পাশাপাশি অন্য সংস্থাও তদন্ত করে দেখছে।’ এছাড়া সাহেদের বিরুদ্ধে উত্তরাসহ কয়েকটি থানায় এসংক্রান্ত পাঁচটি মামলাও হয়েছে।
সাহেদের বিরুদ্ধে তথ্য জানতে র্যাবের হটলাইন :রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ জানতে হটলাইন চালু করেছে র্যাব। হটলাইন নম্বরে কল করে কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীরা সাহেদের ব্যাপারে তথ্য ও অভিযোগ জানাতে পারবেন। এছাড়া এ বিষয়ে আইনি সহযোগিতার জন্যও ভুক্তভোগীরা যোগাযোগ করতে পারবেন। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং থেকে হটলাইন চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। হটলাইন নম্বরটি হলো ০১৭৭৭-৭২০২১১। এবং ই-মেইল আইডি হলো ত্ধনযয়.রহাবংঃ—মসধরষ.পড়স।
প্রসঙ্গত, গত ৬ ও ৭ জুলাই র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। এ সময় পরীক্ষা ছাড়াই করোনার ভুয়া সনদ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে র্যাব রিজেন্ট হাসপাতাল ও তার মূল কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ঐ দিনই উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা হয়। এরপর থেকে সাহেদ পলাতক ছিলেন। পরে ১৫ জুলাই ভোরে ভারতে পালানোর সময় সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেফতার করে র?্যাব। সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, জাল টাকা, প্রতারণাসহ অর্ধশতাধিক মামলা হয়েছে। বর্তমানে সাহেদ ডিবির রিমান্ডে রয়েছেন।
