বৃষ্টি থামছে না, কমছে না বন্যাও। টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুরসহ দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ফরিদপুরে পানির তোড়ে ভেঙে গেছে শহর রক্ষা বাঁধ। কুড়িগ্রাম, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলেও পানি কমছে না। কিছু কিছু এলাকা থেকে পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। ফরিদপুরে পানির তোড়ে ভেঙে গেছে শহর রক্ষা বাঁধ।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মুন্সীগঞ্জের চারটি উপজেলার নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর প্রায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পদ্মার ভাঙনে টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। পদ্মার পানি ভাগ্যকূল ও মাওয়ায় বিপত্সীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। আগামী দুই দিন গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া।
মুন্সীগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস বুলবুল জানান, বন্যাকবলিত পরিবারে জন্য এ পর্যন্ত ৪৫ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং নগদ আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধির ফলে শেরপুরের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। কামারের চর, চর মুচারিয়া, চর পক্ষীমারী, বলাইর চর, রৌহা, বেতমারী-ঘুঘরাকান্দি ও লছমণপুর ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন পানিবন্দি। শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বন্যার পানি বয়ে যাওয়ায় উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে ৪ সেন্টিমিটার কমে গতকাল রবিবার বিপত্সীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বি এম রুহুল আমিন রিমন জানান, এ পর্যন্ত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ৭০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা রফিকুল আলম জানান, বন্যায় দেড় হাজার খামারের মাছ ভেসে গেছে।
নাগরপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীতে পানি বাড়ায় টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উপজেলার নাগরপুর, সলিমাবাদ, দপ্তিয়র, গয়হাটা, ভারড়া, মোকনা, পাকুটিয়া, ধুবড়িয়া, সহবতপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নাগরপুর সরকারি কলেজ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নাগরপুর-চৌহালী সড়কে পানি উঠেছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটছে শত শত মানুষ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
ফরিদপুরে পানির তোড়ে ভেঙে গেছে শহর রক্ষা বাঁধ
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরের পদ্মার পানি গতকাল বিপত্সীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল সকালে বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে শহরতলীর আলিয়াবাদ ইউনিয়নের শহর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ। বাধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে পানি প্রবেশ করেছে অন্তত পাঁচটি গ্রামে। গ্রামের মানুষ বেড়িবাঁধের রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে রাস্তায় ফাটল দেখা দেওয়ায় ফরিদপুর চরভদ্রাসন আঞ্চলিক সড়কে যানচলাচল সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফাটলের স্থানে জিও ব্যাগ ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই সড়কের বেশ কয়েকটি স্থান পদ্মার পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদপুরের সদরপুরে পদ্মা-আড়িয়াল খাঁ পয়েন্টে বন্যার পানি গতকাল রবিবার ১ সেন্টিমিটার কমলেও এখনো বিপত্সীমার ১০৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, শিবচরে পদ্মার পাশাপাশি এবার আড়িয়াল খাঁ নদের তীরেও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের বন্দরখোলা ও চরজানাজাত ইউনিয়নের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এই দুই ইউনিয়নের জনগণের বসতঘর, রান্নাঘর, টয়লেট, গোয়ালঘরে এখন কোমর সমান পানি।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ভারী বর্ষণের কারণে কুড়িগ্রামে নদনদীর পানি নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। ১২ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১২ সেন্টিমিটার, সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ৯ সেন্টিমিটার ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বিকালে ধরলার পানি বিপত্সীমার ৫৫ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়ায় ৫১ ও চিলমারীতে ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
