সন্দেহভাজন খুনি গ্রেফতার হলেও অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২০, ২৩:১২

বাংলাদেশি আমেরিকান প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহ (৩৩) হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন খুনিকে গ্রেফতার করলেও পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্ত করছে। সন্দেহভাজন খুনি টাইরেস ডেঁভো হাসপিল খুনের ঘটনায় জড়িত এ ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডে আরো কেউ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত কি না তার অধিকতর তদন্ত চলছে জোরেশোরে।

হাসপিলের সঙ্গে আর্থিক বিরোধ ছাড়াও বেশ কিছু বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। হাসপিল ও ফাহিমের এই আর্থিক বিরোধে কেউ ইন্ধন জুগিয়েছে কি না তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। যদিও হাসপিল এখনো পুলিশের কাছে কিছু স্বীকার করেনি। তার বিরুদ্ধে সেকেন্ড ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে হাসপিলের প্যারোলবিহীন ২৫ বছর থেকে আজীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

এদিকে ফাহিম সালেহ হত্যার সুষ্ঠু বিচার চায় যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটি। সন্দেহভাজন খুনি গ্রেফতার হলেও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকে। তারা বলছেন, ফাহিম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একজন তরুণের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। আমরা চাই, খুনির এমন শাস্তি হোক যাতে কেউ এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সাহস না করে। স্থানীয় সময় রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে সোমবার বিকাল ৫টায় ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের সোনার বাংলা চত্বরে অনুরূপ সমাবেশ ডেকেছে লিটল বাংলাদেশ প্রেসক্লাব।

টাইরেস ডেঁভো হাসপিলকে জামিন না দিয়ে স্থানীয় সময় শুক্রবার মধ্যরাতের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শনিবার তার আইনজীবী স্যাম রবার্টস এক বিবৃতিতে বলেন, এ মামলা দীর্ঘ এবং অধিকতর জটিল হবে।

পুলিশের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, হাসপিলের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের বিষয় ছাড়াও ফাহিম সালেহের আরো কিছু ব্যাবসায়িক বিষয় অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বিশেষ করে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসায় কারো সঙ্গে তার বিরোধ ছিল কি না। বাংলাদেশে জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’য়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ। গোয়েন্দারা বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। আর তা হলো, বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে পাঠাওয়ের মাধ্যমে। ব্যবসাসফল ‘পাঠাও’। এত কিছুর পরও ফাহিম সালেহ কেন ‘পাঠাও’ ছেড়ে বাংলাদেশে বাইক শেয়ারিং অ্যাপ ‘জোবাইক’ এবং বাস টিকেটিং অ্যাপ ‘যাত্রী’ চালু করলেন? একইভাবে নাইজেরিয়ায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘গোকাডা’ কেন বাধার মুখে পড়েছিল? ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে এর সবকিছুই জানার  কথা হাসপিলের।

নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এক পুলিশ কর্মকর্তা সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী হাসপিলকে ‘নিউ আমেরিকান সাইকো’ বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, ফাহিম সালেহকে হত্যার পরও তার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছিলেন হাসপিল। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে উবার পরিবহনের ভাড়া মিটিয়েছেন। হার্ডওয়্যার স্টোর হোমডিপো থেকে ইলেকট্রিক করাত কিনেছিলেন। ক্রেডিট কার্ডের সূত্র ধরেই পুলিশের নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির পলাতক টাস্কফোর্স তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। শুক্রবার নিউ ইয়র্ক সিটির ক্রসবি স্ট্রিটের অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট থেকে হাসপিলকে গ্রেফতার করে। এয়ার বিএনবি পরিচালিত এই অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়াও পরিশোধ করা হয়েছে ফাহিম সালেহের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে।

নিউ ইয়র্ক পুলিশের কাছে আসা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি বেলুন ধরে আছেন হাসপিল। তার সঙ্গে একজন নারী। বড় আকারের পার্টি বেলুনটি ফাহিম সালেহের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে কেনা হয়েছিল। পুলিশ বলছে, ফাহিম সালেহকে হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর পার্টি করার জন্য বেলুনগুলো কিনেছিল হাসপিল।

এদিকে শোক ও ভালোবাসায় নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্মরণ করছেন ফাহিম সালেহকে। ইস্ট লোয়ার ইস্ট ম্যানহাটনের ২৬৫ হাউস্টন স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ফুল দিয়ে ফাহিমকে স্মরণ করেছেন অনেকে। ফুলে ফুলে শোভা পাচ্ছে অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশদ্বার। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ফাহিম সালেহের পরিবার এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। যে কারণে তারা কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহী নন। ফাহিম সালেহের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সপ্তাহে তার লাশ দাফন করার কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বিকালে নিউ ইয়র্ক সিটির লোয়ার ইস্ট ম্যানহাটনের বিলাসবহুল কনডোমিনিয়াম থেকে ফাহিমের টুকরো করা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।