গত ১৫ জুলাই সীমান্ত দিয়ে ভারতে বোরকা পরে পালানোর সময় ধুরন্ধর সাহেদ র্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোড়জোড় তুঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে সরকারি ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মধ্যেই রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় দফায় সুনাম আর দাপটের সঙ্গেই সরকার চালাচ্ছেন। শেখ হাসিনা বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রবাহে নিজের দক্ষতা আর প্রজ্ঞায় এক অন্যূন উচ্চতায় আসীন করেছেন। দেশের বৃত্ত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনীতিবিদদের প্রেরণার উেস পরিণত হয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো— সরিষার ভিতরেই ভূত। সরকারের বিগত প্রায় ১২ বছরের শাসন আমলে সুযোগ সন্ধানী ডজন ডজন ছদ্মবেশীরা দলে অনুপ্রবেশ করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। সদ্য স্বাধীন দেশের সাড়ে তিন বছরের শাসন আমলে খোদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুর্নীতির সয়লাব দেখে আফসোস করে বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ তাই ইতিহাসই বলে আমাদের অনেকেরই রক্তের সঙ্গে দুর্নীতির একটা সংযোগের গন্ধ বেশ পুরোনো। বর্তমান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে শাসনভার। তিনি নিশ্চয়ই এই দুর্বৃত্তায়নের পথকে প্রসারিত করবেন না।
সরকারের চলমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতে ঘাপটি মেরে থাকা হোয়াইটকালার ক্রিমিনালদের মুখোশ উন্মোচন বাংলাদেশ জনগণের হূদেয়র গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। মুখোশ লেবাসধারী এই প্রাণীরা সভ্য ভব্য আর মুখে জনদরদী প্রেমভাবাপন্ন আওড়ালেও ওরা মনের কথা প্রাণের লোককেও বলবে না। মুখোশের আড়ালে ওদের আসল রূপ নিরূপণ নেহায়তই কঠিন ব্যাপার। জটিল তারে জড়িয়ে ফেলাই ওদের স্বভাব। শেখ হাসিনা সরকার নিজের ঘর থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান জিরো টলারেন্সের সময়োচিত এই সিদ্ধান্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন আশা ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। চলমান এই দমননীতির মাধ্যমে হাল আমলের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে। এতে রাজনীতিতে কোনঠাসা ক্লিন ইমেজের মানুষগুলোর দিগন্ত যেমন প্রসারিত হবে, তেমনভাবে রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সরকারের প্রতিটি বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি ৭২ সালের মূল মহান সংবিধানে ৭৭ অনুচ্ছেদ কার্যকর করতে হবে। আমাদের দেশে ১৯৮০ সালে ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত আইনটি কার্যকর হয়নি।
চিহ্নিত কালো রঙয়ের অপরাধীদের সকলে চিনে এবং ঘৃণার চোখে দেখে। দেশের আইন, শাসন, বিচারব্যবস্থা ওদের বিচারের মুখোমুখি করে। আইনও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু ভদ্রবেশী অপরাধীদের বিচার মুখোমুখি করার জন্য সুস্পষ্ট কোনো আইন নেই। এই অপরাধীদের আচরণ ভব্য ও সভ্য জাতীয়। তাই সামাজিক জীবনে চুরি, চামারি, ছিনতাই ছেড়ে ওরা শরীরে ভদ্রতার প্রলেপ দিয়ে বনে গেছে হোয়াইট ক্রিমিনাল। রং পালটিয়ে হয়ে গেছে বড় বড় রাজনৈতিক নেতা। আইন বিজ্ঞান (Criminology) বিশ্লেষণে এমন অপরাধ তিনটি প্রক্রিয়ার সমন্বয় থাকতে হয়। প্রথমত দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিকরণ, (Criminalisation of politics) এই প্রক্রিয়ায় অপরাধীরা আইনি ঝামেলা ও নির্দ্বিধায় চলাফেরা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নেতার পাশে ভিড়তে থাকে এবং আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। দ্বিতীয়ত রাজনীতিবিদদের দুর্বৃত্তিকরণ (Politicisation of criminals) হলো অপরাধ প্রবণের মানসিকতা সম্পন্ন নেতা সমাজে দখলবাজি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও নিজেকে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রাখতে দলের বাইরে নিজস্ব একটি অদৃশ্য বলয় তৈরি করে। আর এই দুই প্রক্রিয়ার কার্যক্রম অবাধে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে (Criminalisation of police) দুর্বৃত্তায়নের পুলিশ বলে। মূলত এই তিন প্রকারের সমন্বয় না হলে অপরাধের একটি শক্ত বলয় তৈরি হয় না।
গত ৯ জুলাইয়ের পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাহেদ করিমের নাম ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে। আঁতকে উঠার মতো ব্যাপার এসএসসি পাশ করা এই দুর্নীতিবাজ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতাসহ ঊর্ধ্বতন এমন কোনো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নেই যাদের সঙ্গে তার ছবি আর কমবেশি সখ্যতা নেই। রাতের টকশোতে আবার নীতিবাক্যের সবক দেওয়ার নজিরও কম নেই। এই ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশকারীরা আসলে কোনো দলের নয়। ওরা সন্ত্রাসী। এরা সময়ে রং পালটায়। সময় এসেছে গোড়া উপড়িয়ে ফেলার।
আলো আঁধারের বাসস্থান একই বৃত্তে থাকতে পারে না। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা যেমন মার্গারেট থ্যাচার, ইন্দিরা গান্ধী, এঞ্জেলা মার্কেলের মতো মহামতি নারী শাসকদের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি শাসনকাল এরইমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন। ঠিকই একইভাবে এই হোয়াইটকালার ক্রিমিনালদের দমন করে বিশ্ব দরবারে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মতো সক্ষমতা তৈরি হবে সেই প্রত্যাশায়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
