করোনা ভাইরাসজনিত রক্তহিম করা সংকট ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর আকার ধারণ করছে। চারদিক থেকে প্রতিনিয়ত পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছে হতাশা ও উত্কণ্ঠার খবর। আশার কোনো আলো নেই কোথাও। এইসব দুঃসংবাদ সমাজের প্রতিস্তরের প্রত্যেক ব্যক্তি মানুষের মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলছে। নেতিবাচক এই বিভীষিকা থেকে কবে যে মুক্তি মিলবে, একমাত্র আলেমুল গায়েবই তা জানেন।
আমরা দেখছি, বর্তমানকালে গোটা বিশ্বই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। নাকাল হতে হচ্ছে সবাইকে। তবে বিশ্বের উন্নত ও অগ্রসর চিন্তার দেশগুলোর কথা আলাদা। শক্তি, সামর্থ্য, সম্পদ, আধুনিকতা ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিত্সাব্যবস্থা দিয়ে তারা করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। তুলনায় দরিদ্র, কম উন্নত, ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতে বিপদ, ঝুঁকি, প্রাণহানি, সংকটের মাত্রা ও ভয়াবহতা অনেক বেশি। গরিব দেশের বাড়তি সমস্যা হলো—স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল ভঙ্গুর অবকাঠামো এবং ঘৃণ্য দুর্নীতি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষুদ্রতা থেকে এইখাত মুক্ত নয়। ফলত, অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দুর্বিষহ জনভোগান্তি আরো চরমে উঠছে।
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান ভয়ংকরতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা জাতিগতভাবে কত অপরিণামদর্শী, সমন্বয়হীন, হঠকারী, নিচ এবং জনগণের জীবনরক্ষায় কতটা উদাসিন। স্বাস্থ্য খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতি, পরিকল্পনা ও সমম্বয়হীনতার কারণে তৈরি হয়েছে লেজেগোবরে অবস্থা। যা কতটা দুঃসহ ও অনভিপ্রেত, সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি, অদক্ষতা, অপেশাদারিত্ব, অবাস্তব পরিকল্পনা, সমন্বয়হীন হঠকারী পদক্ষেপ উদ্ভূত পরিস্থিতিকে আরো বেশি ঘোলাটে ও বিপজ্জনক করে তুলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার তিন মাস পার হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। নমুনা পরীক্ষার কার্যক্রম চলছে এলোপাতাড়িভাবে। বিলম্বিত রিপোর্ট নিয়ে বাড়ছে জটিলতা। যে অবস্থায় চীন প্রতিদিন একটি শহরে ১০ লাখ নমুনা পরীক্ষা করেছে, প্রায় একই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে পরীক্ষা হচ্ছে দৈনিক ১৪-১৫ হাজার নমুনা। এর ফলে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা কত, সেটি জানা যাচ্ছে না। পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত ল্যাব ও দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবও প্রকট। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, চাহিদা মাফিক করোনা পরীক্ষার কিট তারা পাচ্ছেন না।
** সংক্রমণের অতি ঝুঁকিতে থাকায় দেশে ১০টি জেলার রেড জোনের বেশ কিছু অঞ্চলে লকডাউন করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না মোটেও। ঢিলেঢালা লকডাউনে মানুষজন স্বাস্থ্যবিধির কোনো তোয়াক্কা না করে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। পুলিশি উপস্থিতিও তেমন একটা চোখে পড়ছে না ঐসব এলাকায়।
প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেছেন, দ্রুত ফলাফল পাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত টেস্টের ডিভাইস চালু করা দরকার, যা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে আছে। এর মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে করোনা পরীক্ষা করা সম্ভব। এ ধরনের কিট বাংলাদেশে আমদানি করা উচিত। তাহলে একদিকে যেমন দ্রুত পরীক্ষা করা যাবে, তেমনি জনগণের ভোগান্তিও কমবে। করোনা সংকট মোকাবিলায় চিকিত্সকরা একদম সামনে থেকে যুদ্ধ করছেন। এরইমধ্যে অর্ধশতাধিক চিকিত্সক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়াও নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী মারা গেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে।
আমাদের কথা হলো—ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। সুরক্ষা পোশাকের গুণগতমান নিয়ে আর যেন প্রশ্ন না ওঠে। সুরক্ষা নিশ্চিত হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল ও সাহস বাড়বে। স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমকর্মীরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের সবার জন্য একটা দাবি ছিল, তাদের যেন একটা প্রণোদনা বা ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের যেন স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা হয়। তাহলে তারা উত্সাহিত হবেন এবং আরো সাহস নিয়ে এ যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। আমরা বারবার বলেছি যে, করোনা হচ্ছে একটা সাম্যবাদী রোগ। এই করোনা কিন্তু রাজাবাদশাহ, ব্যবসায়ী, চিকিত্সক, ধনী গরিব কাউকেই চেনে না। কাজেই অসচেতন হলেই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
করোনাকালীন এই দুঃসময়ে আমরা কী সবাই মিলে, কাঁধে কাঁধ রেখে করোনার মতো জাতীয় দুর্যোগকে প্রশমনের চেষ্টা করতে পারি না?
n লেখক :গবেষক
